Monday, February 14, 2011

ও ফেনোমেনন, মাই ফেনোমেনন !!


১.

কতই বা বয়েস, এর চেয়ে ঢের বুড়ো খেলোয়াড়ারদের(এই মুহুর্তে চট করে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের রায়ান গিগসের নামটাই মাথায় আসল) মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর এন্তার রেকর্ড আছে। তবে দীর্ঘদিন বিষফোঁড়া হয়ে থাকা ইনজুরির সাথে শেষমেশ হার মানতে বাধ্য হলেন তিনি। মাত্র চৌত্রিশ বয়েসেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ঢের হয়েছে, এইবার বুটজোড়া তুলে না রাখলেই নয়। আর কখনো ফুটবল মাঠে ডিফেন্ডারদের তুর্কি নাচন নাচাবেননা তিনি। আদিওস...রোনালদো লুইস নাজারিও দে লিমা, আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে দুর্দান্ত স্ট্রাইকারটিকে আর কখনো মাঠে দেখা যাবেনা।

২.

তখনও ফুটবলের সাথে গাঁটছড়া অতটা মজবুত হয়নি, ইউরোপিয়ান লীগে মজে থাকার সময়টা এসেছিল আরো পরে। পত্রিকা মারফতই খবর যা একটু রাখা হত। সে সময়টাও বেশ আগের, তখন প্রাইমারি স্কুলের চৌকাঠ পার হইনি। এমন সময় শুরু হয়ে গেল বিশ্বকাপ ফুটবল। ফ্রান্সে অনুষ্ঠেয় ওই আসরের শুরু থেকেই টেকো মাথার দোহারা গড়নের এক খেলোয়াড় নিজের জাত চিনিয়ে দিচ্ছিল। ব্রাজিল সমর্থকদের চোখের মনিতে পরিণত হতেও খুব বেশি সময় লাগলনা। ক্ষিপ্রগতির সাথে পেনাল্টি বক্সে দুর্দান্ত ফিনিশিং এর কারণে বাকিদের থেকে সহজেই তাকে আলাদা করে যেত। এর মধ্যে ব্রাজিলও তরতর করে ফাইনালে উঠে গেল। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স, আর সাথে স্বাগতিক দেশের স্বতঃস্ফূর্ত দর্শক সমর্থন। ব্রাজিলের পাঁড় সমর্থক আমার বাবার মত বাংলাদেশের লাখো ব্রাজিল ভক্ত তখন একাট্টা , টানা দ্বিতীয়বারের মত শিরোপা এবার ঘরে না এসেই পারেনা। আর তুরুপের তাস ফর্মের তুঙ্গে থাকা রোনালদো তো ছিলই। কিন্তু সব আশায় জল ঢেলে দিয়ে ফাইনালে নায়ক হয়ে গেলেন আরেক জীবন্ত কিংবদন্তী, জিনেদিন জিদান। পুরো মাঠে রোনালদো নিজের ছায়া হয়েই রইলেন। ব্রাজিলকে ধরাশায়ী করে বিশ্বকাপ গেল লা ব্লুজদের ঘরে। রোনালদোকে ওইদিন কাঁদতে দেখেছিলাম কিনা মনে নেই, তবে ব্রাজিল ভক্ত বাবার চোখের কোণে চিকচিক করা অশ্রু এখনো আমার স্পষ্ট মনে পড়ে।

৩.

মূলত তখনই রোনালদো নিয়ে আমার মুগ্ধতার শুরু। বার্সেলোনা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ট্রান্সফার ফি তে ইণ্টারন্যাসিওনালে(ইন্টার মিলান বললেই মানুষ বেশি চেনে) আসার খবরও আমার অজানা নয়। ইতালিয়ান ফুটবলের রাজপথটা তখনও ঠিকঠাক চেনা হয়ে ওঠেনি, ফলে খবরের পাতায় রোনালদোর কেরদানির কথা পড়েই মন ভরাতে হত। এর মধ্যেই অবশ্য ইনজুরির সাথে মিতালী বেশ জমে উঠেছে। তবে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকার কারণে বিস্মৃতির গর্ভ তলিয়ে যাওয়ার যে সূক্ষ্ণ আশঙ্কাটা ছিল সেটাকে তিনি অচিরেই ভুল প্রমাণ করলেন তিনি। সময়টা ২০০২ সাল। এশিয়ার মাঠে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের আসর। একদিকে শিরোপাধারী ফ্রান্স, আর হট ফেভারিট আর্জেন্টিনার ভীড়ে সেলেকাওদের অনেকেই হয়তো গণায় ধরতে ভুলে গিয়েছিলেন। পরের ইতিহাসটা অবশ্য সবার জানা। এলাম, দেখলাম ,জয় করলাম স্টাইলে ইনজুরি থেকে তার প্রত্যাবর্তনটা হল দুর্দান্ত রকমের রাজসিক। নিজে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি দলকেও এনে দিলেন বহুল আরাধ্য পেন্টা। আগের বিশ্বকাপের দুঃসহ স্মৃতিকেও দারুণভাবে ধামাচাপা দিলেন।

৪.

এই বছরটা অবশ্য রোনালদোর জন্য আলাদাভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই বছরেই যে রিয়ালের নক্ষত্রমণ্ডলের আরো একটি জ্বলজ্বলে তারা হিসেবে নিজের নাম লেখালেন তিনি। তবে রোনালদোর সাথে আমার এরপরের স্মৃতি খুব একটা সুখপ্রদ নয়। তখন আমি ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের অন্ধ সমর্থক। সেই সময়কার লাল শয়তানের দলও নেহাত ফেলনা ছিলনা। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লীগের নক-আউট স্টেজে ওল্ড ট্রাফোর্ডেই ম্যানইউর বিপক্ষে দুর্ধর্ষ এক হ্যাট্রিক করে বসলেন তিনি। পরের বছরগুলোতে রিয়ালে তার থাকাটা খুব একটা সুখকর হয়নি। ফেরারীর মত ধাওয়া করা সেই ইনজুরি তো ছিলই, সেই সাথে বল্গাহীন ওজন এবং মাঠের বাইরের উটকো সব কারণে তিনি নিয়মিতই সংবাদের শিরোনাম হতে থাকেন।ফলাফল, কোচের গুডবুক থেকে তার নাম কাটা পড়ার দশা হয়। এর মধ্যেই এসে যায় আরেকটি বিশ্বকাপ।

৫.

এইবার তাকে দলে নেওয়া নিয়ে বেশ একচোট সমালোচনা হয়ে যায়। ততদিনে তিনি বেশ মুটিয়ে গেছেন, বেঢপ শরীরে তাকে চেনা হয়ে পড়ে দায়। তারপরও ধারে না কাটলেও ভারে নিশ্চয় কাটবেন, এমন আশায় কোচ পাহেইরা তাকে দলে রাখেন। কোচের আস্থার প্রতিদান তিনি এবার আর সেভাবে দিতে পারলেননা। ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্নও কোয়ার্টার ফাইনালে মুখ থুবড়ে পড়ে। এখনো আমার মনে পড়ে, ওইবার স্থূলদেহের রোনালদোকে বলের পেছনে দৌড়ানোর নিস্ফল প্রয়াস দেখে মনে হচ্ছিল, এ আমি কাকে দেখছি? এ কি সেই খেলোয়াড়, যিনি ঝড়ের বেগে বক্সে ঢুকে একমেবাদ্বিতীয়ম বডি ডজে মার্কারদের ছিটকে ফেলে দেন এবং বলাই বাহুল্য, নির্ভুল মুন্সীয়ানায় বলটাকে জালে জড়িয়ে দেন? তারপরেও বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নামটাকে পাকাপাকিভাবে খোদাই করার ভুল তিনি করেননি। গার্ড মুলারকে ছাড়িয়ে রোনালদো হয়ে যান বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা খেলোয়াড়। এর মাঝে ক্লিন্সমানের পরে টানা তিন বিশ্বকাপে কমপক্ষে তিন গোল করা খেলোয়াড়ও হন তিনি।

৬.

এরপরের সময়টাকে আমি বিস্মৃতির সময়ই বলব। রিয়াল থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে খুব তাড়াতাড়ি তিনি এসি মিলানে চলে আসেন। ইতিমধ্যে ফর্মহীনতা,ওজন সমস্যার সাথে সেই পুরনো শত্রু ইনজুরির সাথে তার লড়াই চলতে থাকে। এদিকে মেঘে মেঘে বেলাও কম গড়ালনা, য়ারেক রোনালদোর আবির্ভাবে একে একে সবাই তাকে ভুলতে বসে। সত্যি বলতে কী, এরপর নিজের আসল ফর্মের ধারেকাছেও তিনি কখনও যেতে পারেননি। তাই ও নিয়ে কথা আর না বাড়াই। তবে তিনবারের ফিফা ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ইন্টার-মিলান বা রিয়াল-বার্সার মত অবিস্মরনীয় দ্বৈরথগুলোর মুদ্রার দুপিঠ থেকেই দেখতে পারার দুর্লভতম অভিজ্ঞতা সহ এমন আরো অনেক অর্জন এই লম্বা সময়ে তিনি নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। ক্লাবের হয়ে ৫১৫ ম্যাচে ৩৫২ গোল বা দেশের হয়ে ৯৭ ম্যাচে ৫২ গোল, এসব পরিসংখ্যানও নিঃসন্দেহে ঈর্ষাজাগানিয়া। তবে রেকর্ড অনেক কথাই বলবে, তবে আমি নিজে অন্তত তাকে মনে রাখব ডিফেন্সচেরা থ্রু গুলো আঁচ করতে পারার বিরলপ্রজ স্ট্রাইকিং ইন্সটিংক্ট, মার্কারদের ছিটকে ফেলার দারুণ ক্ষমতা, পেনাল্টি বক্সে চিতার মত ক্ষিপ্রতা, দুপায়েই শট নেওয়ার দক্ষতা এবং অসাধারণ ফিনিশিংয়ের কারণে। আমাদের সময়ে বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে বড় মঞ্চে তার মত আর কেউ বোধকরি নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। এর মধ্যেই আরো অনেক স্ট্রাইকার আসবে, অনেকে গোলের তুবড়ি ছোটাবেন কিন্তু দ্য ফেনোমেনন আদপে একজনই।

একজন আর্জেন্টাইন সমর্থক হয়েও বিদায়বেদায় তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি, গুরু...তোমায় সেলাম। টেকো মাথার লোকটিকে আমার মত লাখো ফুটবলামদীদের পক্ষ থেকে আরো একবার স্যালুট!!

Thursday, January 13, 2011

মেঘ, নদী আর পাহাড়ের দেশে-৪

গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়ার হ্যাপা এতদিন কেবলই শুনেছি, তবে রেমাক্রিবাজারে এসে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। সামনে বেশ উঁচুমতন একটা টিলা, ওটার নিচে ইঞ্জিন নৌকা আমাদের নামিয়ে দিল। এবার তো একগাদা মালপত্তর নিয়ে ঐ পাহাড় টপকাতে হবে, ভাবতেই মন খানিকটা দমে গেল। কালঘাম ছুটিয়ে আমরা যখন পাহাড়ের ওপরে ইউএন্ডিপির রেস্টহাউজে পৌঁছে কুকুরের মত জিভ বের করে হাপাচ্ছি, তখন মেজাজটা দ্বিতীয় দফায় খিঁচড়ে গেল। রেস্টহাউজে একটাই বেশ বড়সড় কক্ষ, তবে সেটা থানচিতে সাক্ষাত হওয়া আমাদের আরেক বন্ধুদের কব্জায় তখন। এখন উপায়? খোঁজ নেওয়ার জন্য আমরা কজন চললাম বাজারের দিকে। সেখানেও অবস্থা তথৈবচ, ঠা ঠা রোদ্দুরের পড়ন্ত দুপুরে সেখানে খুব একটা জনমনিষ্যির পাত্তা দেখলামনা। তবে বাজারটা যতটা ছোট মনে করেছিলাম, ততটা ফেলনা নয় মোটেই। বেশ বড় খোলামেলা একটা জায়গা, চারদিকে বেশ কিছু দোকান। বরাতটা অবশ্য বেশ ভালই বলতে হবে, শেষ পর্যন্ত থাকার একটা বুদ্ধি মিলে গেল। রেস্টহাউজের বারান্দাটা পুরোটাই কাঠের, সেখানেই চাদর বিছিয়ে একরাত দিব্যি পার করে দেওয়া যাবে। শেষমেশ এক রেস্টহাউইজেই আমরা একই ভার্সিটির উনিশজন ব্যাচমেট, কাকতালটা বেশ জবরদস্ত বলতেই হবে। এর মাঝে নৌকায় উদরপুর্তির জন্য বরাদ্দকৃত চিড়ে-কলা তখনো পুরোপুরি সাবাড় করতে পারিনি, শির হল দুপুরে আর কিছু না খেয়ে সেটা দিয়েই চালিয়ে দেওয়া হবে। সবাই তখন টানা ছ ঘন্টার দুর্ধর্ষ জার্নি বাই বোটের পর রীতিমত জেরবার, ঐ কাঠের মেঝেতেই চাদর বিছিয়েই সটান শুয়ে পড়লাম। এই করতে করতে বিকেল গড়িয়ে গেল।



রেমাক্রিবাজারে কোন মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রশ্নই ওঠেনা, তবে একেবারেই পাণ্ডববর্জিত বলতে একটু ভুল হবে। রেস্টহাউজের পেছনে একটা বিডিয়ার ক্যাম্প, সেখানে গিয়ে আমাদের উপস্থিতি জানান দিতে হল। এই দুর্গম স্থানে একদুদিনের জন্য আসাটা আমাদের জন্য অ্যাডভেঞ্চারের দারুণ মওকা হতে পারে, কিন্তু মাসের পর মাস সবকিছু থেকে সংশ্রবহীন অবস্থায় এখানে দায়িত্বব্রত পালনের তাগিদে পড়ে থাকা যে সহজ কম্মো নয়, সেটা ওই দশায় খানিকটা হলেও ঠাহর করতে পেরেছিলাম। তবে সুবিধা এই যে, যোগাযোগের জন্য হেলিকপ্টারের সাহায্য নেওয়া যায়, খানিক বাদেই দেখলাম আমাদের সামনেই একটা কপ্টার সশব্দে উড়ে গেল।


আগেই টের পেয়েছিলাম, এখানে রাতের খাওয়াটা বেশ আগেই সেরে ফেলতে হপবে। সে অনুযায়ী বাজারে বিলিব্যবস্থাও করে ফেলেছিলাম। খাবারের আইটেম বলতে কেবল সেদ্ধ আন্ডা, তার সাথে মসুরের ডাল, আর পাহাড়ী চালের লালচে ভাত। তবে স্থান-কাল-হাতযশ গুণে সেটাই আমরা গোগ্রাসে গিললাম, এবং বেশ তৃপ্তি করেই খেলাম। খেয়েদেয়ে হাতঘড়িতে দেখি মোটে রাত আটটা, অথচ ইলেকট্রিসিটিবিহীন রেস্টহাউজে আমাদের সামনে গোটা রাত পড়ে আছে। শুরু হল ম্যারাথন আড্ডা। এবারও স্থান-কালের একটা প্রভাব প্রচ্ছন্ন তো ছিলই, তা না হলে আদিরসাত্মুক রসরসিকতার ধার না ধেরে আড্ডাটাই বা খুব দ্রুত আধিভৌতিক গপ্পোর দিকে মোড় নেবেই বা কেন? সবাই নিজের থলি থেকে যতসব অদ্ভুতূড়ে কাহিনি ফেঁদে বসতে লাগল। বাইরে ঘুটঘুটে আঁধার, কেমন যেন একধরনের অপার্থিব নৈঃশব্দ, তারওপর গোটা রাতটাও কাটাতে হবে রেস্টহাউজের বারান্দায়,সব মিলিয়ে আমাদের কজনের গা যে একেবারেই ছমছম করেনি, বললে ভুল হবে। এমনকি দু একজন তো কুকুরের ডাক শুনেই সেটাকে কোন অভিশপ্ত প্রেতাত্মার আর্তনাদ বলে রায় দিয়ে ফেলল। যাই হোক, মেলাক্ষণ আড্ডা শেষে মুখে হাতে কষে মশকরোধী ওডোমস মেখে আমরা ঘুমুতে গেলাম।


পরদিন সকালে আমাদের এক বন্ধু শুধাল, দোস্ত, কাল রাতে বৃষ্টি পড়েছে নাকি? বন্ধুবর কোনদিন গঞ্জিকা সেবন করেছে বলে জানা নেই, তারপরও আমরা এক নিমিষে তাকে গাঁজাখোর বানিয়ে দিলাম। চারদিক শুকনো খটখট করছে, এর মধ্যে আবার বৃষ্টি আসবে কোত্থেকে? ওদিকে বন্ধু তো নাছোড়বান্দা, নাহ! কানের কাছে আমি বিষ্টি পড়ার আওয়াজ শুনেছিই, কোন ভুল নেই। আমরা পড়ে গেলাম ফাঁপড়ে। ঘটনা কী তবে? খানিক বাদেই ফাঁস হল গোমর। মাঝরাত্তিরে আরেক বন্ধুকে প্রকৃতি বেমক্কা ভীষণভাবে ডাক দেয়, কিন্তু ভূতের গল্প টল্প শুনে সে আর কিছুতেই নিচে নামার সাহস করতে পারেনা। শেষমেশ নচ্ছারটা ওই বারান্দা থেকেই আরেকজনের গায়ের ওপর দিয়ে কম্ম কাবার করে ফেলে। আর সেই শব্দকেই বন্ধুপ্রবর আধো ঘুমের ঘোরে বৃষ্টি বলে ঠাউরে নেয়। বুঝুন ব্যাপার!



পরের দিনটা এবারের সফরের সবচে গুরুত্বপূর্ন দিন, যাকে বলে গোল অফ দ্য জার্নি, সেই বহুল প্রতীক্ষিত বহুলশ্রুত নাফাখুম যাত্রা। খুব সকাল বেলা উঠে ভালমত পয়-পরিষ্কার হয়ে নিলাম। সামনে আট কিলোর মত হেঁটে পার হতে হবে, ফলে পেটে কিছু দানাপানি না পড়লেই নয়। এই কিম্ভুত স্থানে সকালে কি পাওয়া যাবে কে জানে? তবে ভাগ্যের কথা, চিড়ে কলা এখানে সুলভ, সেটা পেটে পুরলে আপাতত ভাবনার একটা সুরাহা করা যায়। চিড়ে কলা তো পেলামই, খেলামও আচ্ছাসে, তবে উপরি হিসেবে পেলাম বিনিভাত( এই জিনিসটা চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রচলিত একটা খাবার, চালকে খানিকটা ফার্মেন্টাইজ করে এটা তৈরি করা হয়, তাই এটা খেয়ে খানিকটা তন্দ্রার ভাব আসেই।) বিনিভাতের রান্নাও দেখলাম দারুণ সুস্বাদু, সবাই অবশ্য চেখে দেখার সাহস করলনা, তবে আমরা বেশ ভালই খেলাম। ওদিকে আমাদের সাথে ঢাকা ভার্সিটির আরেক গ্রুপও জুটে গেল। দুজন পাহাড়ী গাইডের বন্দোবস্তও করে ফেলা হয়েছে, তাদের দেখানো পথেই আমাদের নাফাখুম যেতে হবে। সামনের লম্বা পথের সবরকম রসদই মজুত। তাই ভোর থাকতে থাকতেই আমাদের ছাব্বিশ জনের বিশাল বহর রেমাক্রিবাজার থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সামনে নাফাখুমের হাতছানি।

Friday, December 31, 2010

মেঘ, নদী আর পাহাড়ের দেশে-৩

থানচি যখন ছেড়ে গেলাম আকাশটা সোনারঙা রোদে ঝকঝক করছে, আগের রাত্তিরের বৃষ্টির কোন ছিঁটেফোঁটাও তখন আর অবশিষ্ট নেই, দিব্যি ঝকঝকে আকাশ।মনটা আমাদের তখন বেজায় ফুরফুরে। তবে মুশকিলটা এই যে, নৌকায় উঠে আমাদের একজায়গায় গ্যাঁট হয়েই বসে থাকতে হল, নো নড়ন চড়ন। এমনিতেই এগারজনের ব্যাকপ্যাক তো ছিলই, তার ওপর যোগ হল চাল,কলা্‌, চিড়ের ভারি বোঝার হ্যাপা। আগেই জানতাম, এই যাত্রাটা হতে যাচ্ছে বেশ লম্বা, নদীতে পানি আচমকা বেড়ে যাওয়ায় রেমাক্রিবাজারে ঠিক কতক্ষণে পৌঁছুতে পারব সেটা তখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছিলনা। মাঝির কথাবার্তা শুনে ঠাহর করতে পারলাম, আজকের দিনটা মোটামুটি কলা-চিড়ের ওপর দিয়েই পার করে দিতে হবে। দুপুর নাগাদ রেমাক্রিবাজারে ঠাঁই গাঁড়তে পারব এমন ভরসাও খুব একটা নেই। ঠিক ঐ মুহুর্তে এসব অযাচিত ভাবনা বয়ে বেড়ানোর কোন খায়েশ আমাদের ছিলনা। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল না করে পারলামনা, আগেরদিনের চেয়ে পানির উচ্চতা বেশ বেড়েছে বলে মনে হল। সেই সাথে স্রোতের ধাক্কাটাও দেখলাম বেশ জোরদার। এক রাতের বর্ষণেই এই অবস্থা, ঘোর বর্ষাকালে না জানি কি দশা হয়?

পাহাড়ে গোত্তা খাওয়া মেঘ

DSC04525

অপরূপা সাঙ্গু

DSC04555

সাঙ্গু পাহাড়ি নদী, থানচি থেকে নাফাখুমের দিকে যেতে পুরোটাই যেতে হবে স্রোতের বিপরীতে, তারমানে আমাদের সময়টা লাগবে অনেক বেশি। পাহাড়ী নদী বলে এর আচরণ ঠিকঠাক অনুমান করাটাও দুরুহ কর্ম, তবে এটা নিশ্চিত এর মাঝে বেশ ক জায়গায় কিছু জেন্টল স্লোপ পার হতে হবে। সেসব জায়গায় নৌকা কিভাবে এই প্রবল স্রোত উজিয়ে চলবে, সেটা ভাবতেই আমাদের শিরদাড়া দিয়ে উদ্বেগের চোরাস্রোত বয়ে গেল। তবে বলতেই হবে,নদীর দুপারের দৃশ্য দেখলে চোখ ফেরানো যায়না। তখনও আমরা থানচি পেরিয়ে এসেছি খুব বেশি দেরি হয়নি, সাঙ্গু এখানে অনেকটাই স্থিরমতি, আচমকা বেগড়বাই করার কোন লক্ষণও আপাতত প্রকাশ পাচ্ছেনা। দুদিকের লোকালয়ের আভাস তখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, মাঝে মাঝে চকিতের জন্য পাহাড়ের কোলে কাঠের খুদে বাড়িও চোখ এড়াবেনা। এই করতে করতে ঘন্টা দেড়েক পার হয়ে গেল, এবার আস্তে আস্তে নদী আপনবেগে পাগলপারা হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে, জল এখন অনেকটাই ঘোলা, নৌকার গতিও কমে গেছে অনেকখানি। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, দুপাশে বেশ কিছু পাথর, তার মধ্য দিয়ে সটান যেন ওপরের দিকে উঠে গেছে। বুঝলাম, সামনেই আমাদের প্রথম নতি পার হতে হবে।

তবে হাত নৌকায় এলে যে ব্যাপারটা চরম আত্মঘাতী হত, সেটা আমরা এর আগেই হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছি। আমাদের সাথেই ঘাট থেকে আরেকদল অভিযাত্রী হাত নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এমনিতেই মন্থর গতি, তায় স্রোতের খপ্পরে হাঁসফাঁস করতে করতে অচিরেই তাদের এক পা এগোয় দুই পা পিছোয় দশা। আমরা যখন তাদের বেশ দূরে ফেলে এসেছি, খেয়াল করলাম তাদের নৌকা উল্টোদিকে ঘুরছে। ঐ নৌকার মাঝির দেখলাম বেজায় সাহস, কিন্তু এটা বুঝতে অন্তত দেরি হয়নি হাত নৌকায় বেশিদূর গিয়ে সেঁধে স্রোতে ভেসে যাওয়ার কোন মানে হয়না। যাই হোক, যা বলছিলাম, নদী্র এসব স্টেপ আপের সময় ইঞ্জিন নৌকাই আখেরে বেকায়দায় পড়ে যায়। কারণ এমনিতেই নৌকার ওজন বেশি, তারওপর কোন পাথরের সাথে গোত্তা খেয়ে তলা ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কাও অনেক। হাত নৌকার পলকা হওয়াতে এসব জায়গায় কিছুটা বাড়তি সুবিধে পায়। প্রথমবারের স্টেপ আপের সময় অবশ্য খুব একটা কষ্ট হলনা, সশব্দে ধুঁকতে থাকা ইঞ্জিন নৌকার ওপর সওয়ার হয়েই ওটা পার করে দিলাম আমরা।

কিন্তু পরের বার থেকেই লাগল যত গোল। এর মধ্যে আমরা তখনও তিন্দুতে এসে পৌঁছাইনি, ওদিকে বেলা এরই মধ্যে অনেকটা গড়িয়ে গেছে। পরের স্টেপ ডাউনে ইঞ্জিন পুরোদমে চালিয়েও দেখলাম নৌকা একবিন্দু নড়ছেনা, ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দুপাশে তখন ভয়ংকরভাবে ফুঁসে ওঠা স্রোত আমাদের পাশ দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। বোঝা গেল, ইঞ্জিনের ওপর ভরসা করা বৃথা, এবার নৌকা থেকে না নামলেই নয়। খুব সাবধানে আমরা খানিকটা তীর ঘেঁষে নেমে পড়লাম। নদী অবশ্য খুব একটা গভীর নয় তখনো। তলায় কিছু আলগা পাথর ছিল, তাই প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হচ্ছিল অতি সন্তর্পণে। তবে যে জায়গাটায় ঠিক নৌকা আটকে আছে ওখানে স্রোত রীতিমত ঘূর্ণিপাক তৈরি করেছে। সেখানে একবার পড়লে আমাদের লাইফজ্যাকেটও যে কোন ফায়দা দেবেনা সেটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হলনা কারো। ততক্ষণে মাঝিরা অবশ্য দড়ি দিয়ে নৌকা বেঁধে রীতিমত টানাহেঁচড়া শুরু করে দিয়েছে। আমরাও মিছে বসে না থেকে হাত লাগাতে শুরু করলাম। এর মধ্যে খুব সতর্কতার সাথে বড় পাথরগুলোকে পাশ কাটিয়ে নৌকা একতিল করে সামনে এগোতে শুরু করল। মাঝিদেরকে দেখে বুঝলাম তাদের দস্তুরমত ঘাম ছুটে যাচ্ছে। অবশেষে প্রথম স্টেপ ডাউনটা আমরা কোন হ্যাপা ছাড়াই পার হলাম।

প্রথম স্টেপ আপ

DSC04591

দড়ি ধরে মার টান

DSC04607

DSC04613

তিন্দুতে নামার ঠিক আগে যে স্টেপ আপটা পেলাম, সেটা অবশ্য আরো গোলমেলে। এখানে পাথরগুলো খুবই বিপজ্জনক, কিছু কিছু তো রীতিমত চোখা। এ জায়গায় নদী অনেকটা চওড়া হয় গিয়েছে, তাই আগের মত "দড়ি ধরে মার টান" পদ্ধতিতে লোকবলও লাগল দ্বিগুন। আমাদের মত কিছু উঁনপাজুরে গেলবার রেহাই পেলেও এবার সবাইকে শক্ত হাতে দড়ি ধরতে হল। এর পর শুরু হল মরণপণ টান। এই করতে করতে এবারের স্টেপ আপটাও মোটামুটি নির্বিবাদে পার হওয়া গেল। আর আমাদের একজনের এক পাটি জুতো সাঙ্গুর জলে চিরতরে হারিয়ে গেল, আফসোস বলতে এটাই। এরপর তিন্দু পৌঁছাতে আমাদের খুব একটা সময় লাগেনি। তবে কাকতাল যে কতটা বিটকেলে হতে পারে, সেটা বুঝলাম তিন্দুতে এসে। আমাদের আরো কিছু ভার্সিটি ফ্রেন্ড দেখি এখানে আড্ডা গেড়ে আছে। তবে তাদের সাথে কথা বলে মনটাই দমে গেল। আগেরদিনের বৃষ্টিতে নাফাখুমের পানি নাকি বেশ বেড়ে গেছে, কোনো গাইডই নাকি নাকি তাদের নিয়ে যেতে রাজি হচ্ছেনা। বাধ্য হয়ে তারা রেমাক্রিবাজার থেকেই নাফাখুম প্রজেক্ট ইস্তফা দিয়ে চলে এসেছে। ভাবনায় পড়ে গেলেও আমরা খুব একটা পাত্তা দিলামনা, দেখাই যাক সামনে কী আছে কপালে। তিন্দু একটা বেশ জনাকীর্ণ পাড়া(অন্তত এসব এলাকার নিরিখে তো বটেই)। আমাদের মাঝি ভাইয়েরা এখানে দেখলাম বেশ প্রেমসে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিচ্ছে। আমাদেরও পেটে খিদেটা বেশ ভালমত চাগিয়ে উঠল, কিন্তু বেরসিক সময় বাগড়া দেওয়ায় সে যাত্রায় ডাল-ভাতের ভোজনের পাট মুলতবি রেখে কলা চিড়ের ফলার দিয়েই দুপুরের পেটপুজোটা সেরে নিতে হল।

তিন্দুতে...

DSC04620

কান্ডারি হুঁশিয়ার..

DSCF0553

তিন্দু ফেলে যখন এসেছি, তখন ঘড়ির কাটা প্রায় বারটা ছুইঁ ছুঁই। তবে আশার কথা এই, সামনের পথ আর খুব বেশি বাকি নেই। আর আশঙ্কার কথা হল, এরই মধ্যে আমাদের একাধিকবার নৌকা ঠেলতে হতে পারে, বিশেষ করে বড়পাথরের ওখানে তো বটেই। বড়পাথর জায়গাটার একটু বর্ণনা এই মওকায় দিয়ে রাখি। বড়পাথর (অনেকে হয়তো আবার রাজাপাথর বলেও চিনে থাকতে পারেন) তিন্দু থেকে বেশ খানিকটা সামনে। হঠাৎ করে দূর থেকে দেখলে মনে হবে, নদীগর্ভে পেল্লায় কিছু পাথর আকাশ ফুঁড়ে উদয় হয়েছে। এটা বোধহয় বলে না দিলেও চলে, এসব দানবাকৃতি পাথরের জন্যই জায়গাটার নাম বড়পাথর। বড়পাথরে পাথরগুলো যেমন বিশাল, স্রোতের তীব্রতাও তেমনি প্রচণ্ড। এ জায়গায় এসে আমাদের কপালে দুশ্চিন্তার বিশাল খাঁজ পড়ে গেল, নৌকা তো স্রোত পেরিয়ে কোনভাবেই যেতে পারবেনা, তবে উপায়? এর আগে যেখানেই নেমেছি, নদীর গভীরতা ছিল কম, কিন্তু এখানে গভীরতা যে আসলে ঠিক কতটুকু তা বলার কোন উপায় নেই। আর একবার পাথরগুলোর সাথে ধাক্কা খেলে আর দেখতে হবেনা বৈকি। কিন্তু উপায়ান্তর না দেখে পাথরগুলোর কিনার ঘেঁষে আমাদের নেমে পড়তে হল। এখানে মোটামুটি উদর পর্যন্ত পানি, তবে স্রোতটা তীব্র বলে আমরা মানবশিকল তৈরি করে নিয়েছিলাম। এ জায়গাটায় নামতেও হিম্মত লাগে, নৌকা ঠেলা তো দিল্লি দূর অস্ত। কিন্তু অন্তত দুজনকে হাত লাগাতে হবেই। আমাদের অনেকের সাহসটা একটু বেশিই ছিল, তাই নৌকা ঠেলে বড়পাথরও পার করে ফেললাম। তারপরও শেষ রক্ষা হতনা, যদিনা আমাদের অকুতোভয় মাঝি অংসাপ্রু একটা ঘূর্ণিপাকে পড়ে তলিয়ে যেতেন। ভাগ্য সেদিন সহায় না হলে আমাদের একজন মাঝিকে সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারতনা, আর মাঝিও নিশ্চিতভাবে পাথরগুলোতে গিয়ে ধাক্কা খেত।

বড়পাথর
DSC00241

DSC00237

DSC00238

বড়পাথরের পর আর তেমন কোন ঝক্কি রইলনা। এবার পাহাড়গুলো আরো গগনচুম্বী হয়ে উঠেছে। এর মাঝে আমরা অনেকটুকু পথ পেরিয়ে এসেছি। বড়পাথরের পরও আরো বার দুয়েক নৌকা টানতে নেমে পরতে হয়েছিল, তবে অসব জায়গায় স্টেপআপগুলো অতটা খাড়া ছিলনা, তাই আমাদের খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি। এসব করতে করতে মোটামুটি বেলা তখন তিনটা ছুঁই ছুঁই। অনেক দূর থেকে পাহাড়ের ওপর একটা ছোট্ট বাড়ি চোখে পড়ল। তিন্দু ছেড়ে আসা অবধি আর কোন ধরনের লোকালয় আমাদের চোখে পড়েনি। বুঝতে পারলাম, রেমাক্রিবাজার এসে গিয়েছি। হিসেব করে দেখলা, সকাল আটটা থেকে বেলা তিনটা, প্রায় সাত ঘন্টার এক রোমহর্ষক সফর আমরা সাঙ্গুবক্ষে কাটিয়ে এলাম। জার্নি বাই বোট বোধহয় একেই বলে!

Saturday, December 25, 2010

মেঘ, নদী আর পাহাড়ের দেশে-২

যাত্রীরা হুঁশিয়ারঃ

আগে থেকেই জানতাম, থানচি আদতে একটা থানা। তবে এখানেও আমাদের জন্য বেশ বড়সড় একটা চমকই অপেক্ষা করছিল। চাঁদের গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে দেখি, সামনে কোন রিকশা বা ভ্যানের টিকিটিরও দেখা নেই। আচ্ছা মুসিবতে পড়া গেল তো! সামনে এগিয়ে তো বিলকুল কপালে হাত, আমাদের আস্ত একটা নদীই পার হতে হবে, তাও একেবারে দেশি হাতনৌকায়। অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা খানিক দোনোমনা করছিলাম কিন্তু খানিক বাদে দেখলাম মানুষজন পিলপিল করে নির্বিবাদে ওই নৌকায়ই পার হচ্ছে। এবার আর গড়িমসির বালাই না করে নৌকায় চড়ে বসলাম। নদীটা অবশ্য ও জায়গায় খুব বেশি চওড়া ছিলনা, তার পার হতে খুব একটা সময় লাগেনি।

যাহা ছিল নিয়ে গেল কাঠের তরী...

DSCF0486

দুষ্টু ছেলের দল

DSCF0489

DSCF0487

বাসস্থান বিড়ম্বনাঃ

থানচি বাজারে গিয়ে এর চেয়েও বড় গ্যাড়াকলে পড়া গেল, গতর রাখার জন্য একটুকরো আশ্রয় এখন কই মেলে? বাজারে খোঁজখবর করে জানলাম এখানে একটা সরকারী বিশ্রামাগার আছে, বরাত ভাল হলে ওটাতেই ঠাঁই মিলতে পারে। বরাতটা আসলে আমাদের একটু বেশি রকমেরই ভাল ছিল, কারণ দৈবক্রমে রেস্টহাউসের কেয়ারটেকারের সাথে আমাদের বাজারেই দেখা হয়ে গেল। তিনি জানালেন, আপাতত রেস্টহাউস ফাঁকাই আছে, আমাদের জন্য তিনটে রুমেরও আশ্বাস দিয়ে দিলেন। আমরা তখন রাতটা যেনতেনপ্রকারে কাটানোর জন্য তৈরি ছিলাম, আর এ যে মেঘ না চাইতেই জল! জলদি মালপত্র রেস্টহাউসে রেখে একটু হাঁফ ছাড়া গেল। ওদিকে পেটের ভেতর ছুঁচোরা তখন ডনবৈঠক করছে। বাজারেই শুনলাম, এই সময়টাতে নাফাখুম প্রত্যাবর্তনকারীদের হারটা খুব বেশি, গত দুদিন নাকি দেদার মানুষ থানচি ছেড়ে গেছে। আর কি অদ্ভুত কাকতাল, সেখানে আবার আমাদেরই জনাকয়েক ভার্সিটিফ্রেন্ডদের সাথে দেখা, ওরা অবশ্য রাতটা থানচিতে কাটাবেনা, দুপুরের খাওয়া সেরেই তিন্দু নামের আরেকটা জায়গায় রওনা দেবে, রাতটা তাদের ওখানেই(তিন্দুতে) কাটানোর খায়েশ।

ঠাঁই মিলেছিল যেথায়ঃ

DSCF0732

একরত্তি বাজার

DSCF0509

জীবনজোব্বাই জীয়নকাঠি!:

থানচি একদমই একটেরে একটা জায়গা, একটা সরু পাকা রাস্তা বাজারের বুক চিরে চলে গেছে, তারই দুপাশে সব দোকানপাট। বিদ্যুতের জন্য সূর্যদেবই ভরসা, সেটা দিয়েই নৈমিত্তিক প্রয়োজন মেটাতে হয় থানচিবাসীকে। রাজ্যের খিদে নিয়ে আমরা যখন একটা হোটেলে ঢুকে পড়লাম বেলা তখন তিনটা ছুঁই ছুঁই। আমাদের হকিকত ছিল এমনই, ওরকম উটকো সময়ে এসব বিটকেলে জায়গায় যা পাওয়া যায় তাই সই। তাই আন্ডার ঝোলের সাথে কচুর তরকারি দিয়ে গলা পর্যন্ত গিললাম, তবে দামটাও কিন্তু ছিল গলাকাটাই। এরকম আনকোরা স্থানে ট্যুরিস্টদের কিছু মালকড়ি গচ্চা দিতেই হয়, তা ও নিয়ে আর খুব একটা গা করিনি। সে যাকগে, খেয়েদেয়ে এসে এবার আমাদের রোখ চাপল, এই মওকায় আমাদের সাধের লাইফজ্যাকেটগুলো নিয়ে একটু হাত-পা মকশো করা যাক, সুযোগ যখন পেয়েছিই। আমাদের রেস্টহাউস থেকে সামনে এগুলে একটা পুকুর ,জলটাও মনে হল বেশ টলটলে। পারলে তো তখনই লাফ দেই এ অবস্থা। যাই হোক, জীবনজোব্বাগুলো গায়ে চড়িয়ে আমরা নেমে পড়লাম জলকেলিতে। ওইদিন সূর্যের তেজ ছিল দারুণ কড়া, আমরা ঘেমে নেয়ে তখন মোটামুটি সারা। পানিতে নামার সাথে সাথে একটা দুর্দান্তরকম প্রশান্তিতে মনটা ভরে উঠল, আর প্রথমবারের মত পানিতে ভাসার মজা তো ছিলই, হোক সেটা লাইফজ্যাকেটের আনুকূল্যে। কিছুক্ষণ হাস্যকরভাবে বেধড়ক হাত পা ছোঁড়ার পর খেয়াল হল, পুকুরের ওপাশে একটা স্কুল, আর সেই স্কুল থেকে কচি কাঁচার দল আমাদের দিকে পলক না ফেলে তাকিয়ে আছে। বুঝলাম ওদের জন্য কতক মাথাবিগড়ানো তরুণের বালসুলভ জলকেলির এমন দুর্লভ বিনোদন হাতছাড়া করা আসলেই শক্ত। ব্যাপার বুঝে আর বেশি সময়ক্ষেপণ করিনি, ওবেলার মত জলক্রীড়ায় ইস্তফা দিতে হল।

নেটওয়ার্কের বাইরে!

এসবকায়কারবার শেষ করতে করতে বেলা ততক্ষণ অনেকদূর গড়িয়ে পড়েছে। আমাদের শরীরে তখন রাজ্যের ক্লান্তি, তাই বিছানায় শুতে না শুতেই সটান ঘুম। ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি বাইরের আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে, সন্ধ্যা হয়ে এল বলে। এখন এক কাপ চা না হলেই নয়। আর আশপাশটা একটু ঘুরে বেড়ালেও মন্দ লাগবেনা। তাই পরের আধাঘন্টায় সবাইকে ঘুম থেকে টেনেহিঁচড়ে তুলে বাজারমুখী হলাম। থানচি বাজার যে নেহায়েতই গরিবী হালের সেটা আগেই আভাস দিয়েছিলাম। তবে ভালমত ঘুরে টের পেলাম, ছোট হলেও মোটামুটি সব ধরনের জিনিসই এখানে সহজলভ্য। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, থানচির মানুষ বেশ ভাল রকম দেশপ্রেমিকও বটে। এখানে এসে একটা জরুরী ফোন করতে গিয়ে দেখি, গ্রামীণের নেটওয়ার্ক বেমালুম গায়েব। রবি, বাংলালিংক বা ওয়ারিদের (হালের এয়ারটেল) অবস্থাও তথৈবচ। তখন আমাদের মধ্যে একমাত্র টেলিটকধারীর মুখে ষাট ওয়াটের ঝকঝকে হাসি। জানা গেল, এখানে টেলিটকের একচেটিয়া ব্যবসা। দেশের টাকা বাইরে লোপাট হতে না দেওয়ার জন্য থানচিবাসীকে একটা ধন্যবাদ তাই দেওয়াই যায়।

ভোরের থানচি

DSCF0504

সূয্যিমামা ওঠার আগে উঠব আমি জেগেঃ

DSCF0738

এবার তবে উপায়?:

মুশকিলটা শুরু হল আসলে ঠিক এরপর। আমামদের পরদিন ভোরেই থানচি থেকে রেমাক্রিবাজার যাওয়ার প্ল্যান, তাই নৌকা ঠিক করে ফেলা তখন আশু দরকার। হাতে বিকল্প ছিল দুটি, বৈঠা নৌকা আর ইঞ্জিনচালিত নৌকা। বৈঠা নৌকার অসুবিধে হল সময়টা লাগবে অনেক বেশি, অয়ার উল্টোপিঠে সুবিধা এই, ইঞ্জিনের কর্ণবিদারী ঘ্যাড়ঘেড়ে আওয়াজ থেকে নিস্তার মিলবে। খরচের দিক দিয়েও বৈঠা নৌকাই সাশ্রয়ী ছিল। তো সাতপাঁচ ভেবে আমরা বৈঠা নৌকার পক্ষেই রায় দিলাম। প্ল্যান তো ঠিক হল, এবার কার্যোদ্ধারের পালা। বাজার চষে বেড়িয়ে একজন মাঝি ঠিক করে ফেলা হল, তিনি আশ্বাস দিলেন দুটো নৌকাতেই আমাদের কাজ চলে যাবে, আর ভাড়াটাও আমাদের নাগালের মধ্যেই। এসব যোগাড়যন্তর করতে করতে নৈশভজের সময় হয়ে এল। লইট্টা মাছ আর শুটকির তরকারি দিয়ে আহার শেষে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, তখন নয়টাও বাজেনি। ওদিকে থানচি তখনই বেশ শুনশান হয়ে পড়েছে, আমাদের রেস্টহাউজেও কেমন এক ধরনের ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা। একজন প্রস্তাব দিল, চল, ছাদ থেকে খানিক ঘুরে আসি। ছাদটাও দিব্যি খোলামেলা, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, অগুণিত তারাদের মেলা বসেছে। ইটকাঠের জঞ্জালে তারা দেখার আসল মজা কখনোই ঠিকমত পাইনি, একসাথে এত তারা দেখে আমাদের নবিশ চোখ তাই আদপেই টেঁসে গিয়েছিল।

সাঙ্গু নদীর তীরেঃ

DSCF0491

সহস্র সারসঃ

DSCF0510

সার বাঁধা নৌকাঃ

DSCF0485

ও মাঝি নাও ছাইড়া দে...:

আড্ডা মারতে মারতে তখন ঘন্টাদুয়েক পেরিয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা বারটা ছুঁই ছুঁই। পরেরদিন খুব ভোরে উঠতে না পারলে সারাদিনের প্ল্যান মাটি, তাই আড্ডার পাট ওখানেই চুকিয়ে দিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে টের পেলাম, শেষরাতের দিকে ভালই একপশলা বাদলা হয়েছে, সবকিছু আর ঝকঝক করছে। কিন্তু এই উটকো বৃষ্টির জন্য খানিক বাদেই যে আমাদের হাপিত্যেশ করতে হবে সেটা আমরা কস্মিনকালেও ভাবিনি। চটজলদি মালপত্র গুছিয়ে যখন নাস্তা করতে বের হব, তখন আমাদের মাঝি দিল আচমকা দুঃসংবাদ। আগের রাতের উটকো বৃষ্টিতে নদীর পানি নাকি বেশ বেড়ে গেছে, তাই দুজন মাঝির একজন নিমরাজি থাকলেও আরেকজন ধনুকভাঙ্গা পণ করেছে, সে যাবেইনা। ব্যাপার শুনে আমাদের মাথায় হাত। খোঁজ নিয়ে জানলাম, নদীর বেশ ক জায়গায় আমাদের খাড়া চড়াই এর মত পার হতে হবে, তাই হাত নৌকা নিয়ে গেলে সাড়ে সর্বনাশ হতে পারে। এখন মুশকিল আসান করতে আমাদের মাথার চুল ছেঁড়ার উপক্রম। বেমক্কা এখন নতুন নৌকা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, যাত্রা্টাও এভাবে অকালে মাঠে( পড়ুন থানচিতে) মারা যায় কিনা সেটা ভেবে আমরা তখন জেরবার। এমন সময় খবর পেলাম একটা ইঞ্জিননৌকা ফাঁকা আছে, কিন্তু মওকা পেয়ে তারা দামটাও হাঁকালো ভালই। আমাদের ধড়ে অবশ্য ততক্ষণে প্রাণ ফিরে এসেছে, তাই মুলোমুলির ভাবনা ঝেড়ে ফেলে ওটাতেই চেপে বসলাম। এদিকে লাগল আরেকটা কেলো, আমাদের থানচির বিডিআর চেকপোস্ট থেকে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি নেওয়ার হ্যাপাও অনেক, সবার নামধাম ঠিকানা দিতে দিতে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়ে গেল।কাকভোরে রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও দেখতে দেখতে বেলাও গড়িয়ে গেল অনেক। অবশেষে সকাল আটটা নাগাদ আমরা এগার জন ইঞ্জিননৌকায় সওয়ার হয়ে থানচি ছেড়ে গেলাম। এবারের গন্তব্য রেমাক্রিবাজার।

Saturday, December 18, 2010

মেঘ,নদী আর পাহাড়ের দেশে-১

টার্মের শেষদিকে সবার অবস্থা হয়ে পড়ে ঝড়ো কাকের মত; ক্লাসটেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট আর কুইজের খপ্পরে রীতিমত ত্রাহি মধুসূদন দশা। এই সময় আমাদের মত বিটকেলে কজন সবার কানে মন্ত্রণা জপে দিতে থাকি, চল বাক্সপ্যাটরা গুছিয়ে একটা ট্যুর দিয়ে আসি। এক দুজন করতে করতে দলও ক্রমে ভারি হয়ে উঠতে থাকে, কিন্তু গোলটা বাঁধে গন্তব্য নিয়েই, যাবটা কই? একজন কক্সবাজারের নাম প্রস্তাব করলে বাকিরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেই, ওজায়গায় কদিন আগেই তো দিব্যি চেখে আসা হয়েছে, এবার নতুন কোথাও, একদম আনকোরা কোথাও যাওয়া চাই। কিন্তু বেমক্কা এরকম নতুন জায়গার হদিস পাই কী করে, যেখানে গিয়ে অন্তত বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চারের সোয়াদ পাওয়া যাবে। ওরকম জায়গা বলতেই তো চোখের সা্মনে বান্দরবানের নামটা আগে ভেসে ওঠে। ও একটা জায়গায় আমাদের কারো খুব একটা ঢুঁ মারা হয়নি। তো বান্দরবান বলতে তো বগা লেকের নামটা চট করে মাথায় চলে আসে, এছাড়া আর কোন দ্রষ্টব্য স্থান সম্পর্কে আমরা ওয়াকেফহাল ছিলামনা। এমন সময় আমাদের আরেক বন্ধু উপযাজক হয়ে প্রস্তাব দেয়, তোরা নাফাখুম থেকে ঘুরে আসতে পারিস, আমরা কদিন আগেই পুজোর ছুটিতে ওজায়গা ঘুরে আসলাম। বন্ধুবর একটু গপ্পোবাজ গোছের হলেও বর্ণনা শুনে মনে হল, তার কথার সিকিভাগও যদি চাপা হয়, তবে আমাদের মজা ষোলআনা উসুল হতে বাধ্য। খানিক বাদে ছবি দেখেতো সবার চোখ কপালে উঠে গেল, নাহ! ব্যাটা আসলেই বাড়িয়ে বলেনি খুব একটা। এর মাঝে সে বিপদসংকুল যাত্রাপথের রোমহর্ষক ফিরিস্তি ফেঁদে আমাদের উৎসাহে জল ঢালার কোশেশ একেবারে করেনি, তা না। কিন্তু আমাদের তখন আর রোখে কে? অতএব ,মিশন নাফাখুমের পরিকল্পনা চূড়ান্ত, এবার ব্যাকপ্যাক নিয়ে রওনা হওয়ার পালা।

নাফাখুমের নাম এর যে শুনিনি তা নয়। ইতোমধ্যে খানকতক পোস্টও পড়েছিলাম নাফাখুম নিয়ে, তবে নাফাখুমের ঢলটা মূলত শুরু হয় প্রথম আলোর চটকদার নকশা পাতায় বেশ ফলাও করে নাফাখুম অভিযানের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর।এর মধ্যে খবর পেলাম, আমাদের আরো কজন বন্ধু ওখান থেকে ঘুরে এসেছে। আমাদের মূল ট্র্যাকটা হবে এরকম, ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান, বান্দরবান থেকে চাঁদের গাড়িতে থানচি,আর থানচি থেকে নৌকাযোগে আরো ঘন্টা পাঁচেক পরে রেমাক্রিবাজার। এখানেই শেষ নয়, রেমাক্রিবাজার থেকে আবার তিন ঘন্টার হাঁটা পথ পাড়ি দিলে তবেই দেখা মিলবে আরাধ্য নাফাখুমের। তবে সবার কন্ঠে অভিন্ন সুর, যেতে হলে কালক্ষেপণ না করে যাত্রা শুরু করা উচিত, কারণ শুকনো মৌসুমে নাফাখুমের সৌন্দর্য খুব একটা খোলতাই হবেনা, তাই যাওয়ার মজা মাটি হয়ে যেতে পারে। তখন সবে অক্তোবরের শেষ হপ্তা চলছে, কিন্তু কার্তিকের মাঝামাঝি সময়ে মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হানা দিয়ে যাচ্ছিল। ঢাকাতেই যখন এ অবস্থা , ধারণা করলাম বান্দরবানের ওদিকে নিশ্চয় দুএক পশলা বর্ষণ হয়েছেই, আর নাফাখুমও শুকিয়ে খটখটে হয়ে যায়নি। তবে সফরের প্রস্তুতি নিতেই শুরুর গেরোটা বাধল। আমাদের দলে তখন বেশ ভিড়ভাড়াক্কা, সবমিলিয়ে ১১ জন এর মাঝেই কবুল বলে ফেলেছে। এর মধ্যে সাঁতার জানে মোটে ৩ জন,(এর মাঝে দুজনকে আবার ছাটাই করে দেওয়া যায়, তারা নাকি কেবল ভেসে থাকতে পারে)। আমরা বাকিরা ডাঙ্গায় নিজেদের তখন নিজেদের বাঘ ভাবতে শুরু করে দিলেও জলে যে রীতিমত কেঁচো, একথা স্বীকার করতে কসুর করিনি। অথচ নাফাখুমজয়ীদের ভাষ্যমতে, সেখানে তিনচারজায়গায় নদী পার হতে হয়, এর মধ্যে একবার পুরোদস্তুর সাঁতার পানিতে। সাব্যস্ত হল, সাঁতারকানাদের জন্য লাইফজ্যাকেট কেনা হবে। এরপরের একদিন এই জীবনজোব্বা জোগাড়ের যন্ত্রণায় পার হল। অনেক হ্যাপার পর, নবাবপুরের এক চিপার ভেতর থেকে সবার জন্য বাহারি লাইফজ্যাকেট কেনা হল। শুরুতে সাঁতারুদের জন্য না কেনার সিদ্ধান্ত হলেও পরে তাদের পৌনঃপুনিক পীড়াপীড়িতে তাদের জন্যেও কেনা হয় (তখন আমরা বুঝতে পারলাম তাদের সাঁতারের দৌড় আসলে কদ্দুর ) । এর মাঝে আমাদের আরেক বন্ধু একদিন দেখি হেলতে দুলতে একটা বিশাল ঔষধের লিস্টি নিয়ে হাজির। আমরা যখন বন্ধুটি কোন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত তা নিয়ে কেচ্ছা ফেঁদে বসছিলাম, তখনই সে বেরসিকের মত বলে বসল, এসব দাওয়াই এবারের অভিযানের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। লিস্টটা ভালমত দেখে পরে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ, জ্বর, সর্দি-কাশি,পেটের ব্যামো থেকে শুরু করে মায় ম্যালেরিয়ার ঔষধও সেখানে রয়েছে। পরে অবশ্য এসবের অনেকগুলোই মোক্ষম সময়ে কাজে এসেছিল, তাই আমাদের মেডিকেল অফিসার বন্ধুও কেন ডাক্তারি পড়লনা, তাই নিয়ে বেশ কিছুদিন আফসোসও করেছিল।

এর মাঝে একফাঁকে আমাদের বাসের টিকিটও কেটে ফেলা হয়। আরেকটা দিন যায় সবার জন্য পাহাড়ি পথে চলার পাদুকা আর চওড়া কিনারঅলা টুপি কিনতে। যাত্রার মাহেন্দ্রক্ষণও দেখতে দেখতে ঘনিয়ে আসে। রাতের বাসে ঢাকা ছেড়ে যাব, আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ভোরের আলো থাকতে থাকতে আমরা বান্দরবান পৌঁছে যাব। তাই কা তব কান্তা বলে আমরা কজন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানুষ বান্দরবানগামী শ্যামলীর বাসে চেপে বসি।

গরীবের ঘরে হাতির পা!

ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার পর যে আশঙ্ককাটা বারবার মনের ভেতর উঁকি মারছিল, সেটা হল রাস্তায় উটকো যানজটের খপ্পরে পড়লে আমাদের প্ল্যানটা একেবারে কেঁচে যাবে, তখন আবার হ্যাপাটাও পোহাতে হবে বিস্তর। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে দেখলাম কুমিল্লায় চলে এসেছি। মধ্যরাত্রির পেটপূজো ও তামাকসেবন শেষে আমরা ফের গাড়িতে চড়ে বসি। তবে বরাত ভাল, যে শঙ্কার ভয়ে কাবু হয়ে ছিলাম সেটা আর মোকাবিলা করতে হনি। বেশ নির্বিবাদেই আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছে যাই। এখান থেকে আবার আরেক প্রস্থ ঝামেলার পর আমাদের এক বন্ধু যোগ দেয়। সে যাকগে, বান্দরবানে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্যের আলো ফুটি ফুটি করছে। তবে বাঁচোয়া এই যে, বাইরে শীতের উপদ্রব ছিলনা খুব একটা, হালকা যা ছিল সেটা আমরা বেশ উপভোগই করছিলাম। ব্যাগট্যাগ নিয়ে আমরা শহরে চলে আসি প্রাতঃরাশটা সেরে ফেলতে। তখন মোটামুটি বাজার সরগরম হতে শুরু করেছে। তবে শহরে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে সেটা আমাদের চোখ এড়ালোনা। ভাজা ডিম,আর পরোটা দিয়ে একটা জম্পেশ আহারের পর গরম চা , মেজাজটা তখন দারুণ তোফা! হোটেলের ম্যানেজারকে শুধালে উনি একগাল হেসে বললেন, গরীবের রবিনহুড,বস্তিবাসীর নয়নের মণি নাম্বার ওয়ান শাকিব খান নাকি শ্যুটিং করতে সদলবদলে বান্দরবানে হাজির। সেটাই দেখলাম তখন টক অব দ্য টাউন। আমাদের আফসোসও যে একেবারে হয়নি তা বলবনা, এহেন জীবন্ত কিংবদন্তীকে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় দেখার বড় খায়েশ ছিল। কিন্তু সময়ের সংকটের কারণে ও প্ল্যানে সাময়িকভাবে ইস্তফা দিতে হল।

চন্দ্রশকটে আমরা কজনঃ

নাস্তা শেষে এবারের গন্তব্য থানচি। আমরা সাকুল্যে ছিলাম এগার জন, একটা চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করা হবে এমনটাই ঠিক হল। তখন আমাদের প্ল্যানই ছিল যত দ্রুত সম্ভব রওনা দেওয়া, কারণ মাঝে চিম্বুক-নীলগিরি ইত্যাদি জায়গায় ক্যামেরাবাজির জন্য বেশ কিছু সময় বরাদ্দ রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের আরেক বন্ধু বেরসিকের মত সেই প্ল্যানে বাগড়া দিয়ে বসল। যেই আমরা চাঁদের গাড়িতে উঠতে যাব হঠাৎ ও ঘোষণা দিয়ে বসল, প্রকৃতি তাকে ভীষণভাবে ডাকছে, ওই ডাকে সাড়া না দিলেই নয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমরা ওকে অনুমতি প্রদান করলাম (বা বলা ভাল, দিতে বাধ্য হলাম)। কিন্তু একি অবস্থা, সে গেলো তো গেলোই, ফেরার আর নামগন্ধ নেই। এদিকে আমরা ঘনঘন ঘড়ি দেখছি আর কুমিল্লায় ঠেসে খাওয়ার জন্য সবাই সবাইকে শাপশাপান্ত করছি। এমন সময় বন্ধু অপেক্ষার পালা সাঙ্গ করে হাজির, শুরুতে বেশ একটা রামধমক দিলেও ওর মুখে অনির্বচনীয় পরিতৃপ্তির হাসি দেখে সে যাত্রায় আর কিছু বললামনা।

চাঁদের গাড়িতে যুত করে চেপে বসার পর শুরু হল আসল মজা। আঁকাবাকা পাহাড়ি রাস্তা, অনেক ওপর থেকে নিচে তাকালে মনে হয় কোন ময়াল সাপ সর্পিল ভঙ্গিতে রোদ পোহাচ্ছে। এর মাঝে ড্রাইভার যেভাবে দক্ষ হাতে গাড়িটা চালিয়ে নিচ্ছিল, তাতে তার এলেমের প্রশংসা করতেই হয়। ওরকম বিটকেলে রাস্তায় এই পথে যে কোন আনকোরা ড্রাইভারই নয়ছয় বাঁধিয়ে ফেলতে পারেন, আর কিছু হলেই একেবারে গিয়ে পড়তে হবে অনেক নিচের খাদে। আমাদের অবশ্য তখন এসব ভাবার ফুরসত ছিলনা, যা দেখছিলাম তাতেই আমরা চোখ বিস্ময়ে ঠিকরে পড়ছিল। এর মাঝে আমরা শৈলপ্রপাতে খানিকক্ষণের জন্য যাত্রাবিরতি করলাম। শৈলপ্রপাত শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। শান বাঁধানো সিঁড়ি দেখে মালুম হল, এখানে পর্যটকেরা হামেশাই হামলা করে থাকেন। শৈলপ্রপাতের মূল আকর্ষণ বলতে তিরতির করে বয়ে চলা একটি ক্ষীণস্রোতা ঝর্ণা। তখনও আমরা নাফাখুমের মাতাল সৌন্দর্য দেখিনি, তাই ওটাই ছিল আমাদের কাছে মহার্ঘ্য। ঝটপট বেশ কয়েকটা ফটোসেশন শেষে আমরা ফের গাড়িতে চেপে বসলাম। নেক্সট স্টপেজ নীলগিরি, এর আগে আর কোন থামাথামি নেই।

শৈলপ্রপাত-

DSCF0367

DSCF0374

DSCF0364

আঁকাবাঁকা পথেঃ

DSC04485

নীলগিরির বুকেঃ

নীলগিরিতেও হেলিপ্যাড!

DSC00150

নীলগিরির নাম আগেও শুনেছি, সেটা যে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটা রিসর্ট বিশেষ সেটাও জানতাম। গিয়ে দেখলাম জায়গাটা বেশ গমগম করছে, আর বেশ সাজান গোছানো, সবকিছুতেই কেমন যেন যত্নের আতিশায্য স্পষ্ট। এই মগের মুল্লুকে এমন বনেদী ব্যবস্থা দেখে আমার বেশ অস্বস্তি হতে লাগল, তবে ভাগ্য এই যে, এখানে আমাদের থাকার কোন প্ল্যানট্যান ছিলনা (বলা ভাল, আসলে মুরোদ ছিলনা, আপনি জলপাইগোত্রীয় না হলে মোটা টাকা পকেট থেকে খসাতে হবে কিন্তু)। তবে বলতে কসুর নেই, এতকিছুর পরেও জায়গাটা ছবি তোলার জন্য রীতিমত দারুণ। মেঘের দল মনে হচ্ছিল পাশ দিয়ে আলগোছে চলে যাচ্ছে, হাত বাড়ালেই এসে ছুঁয়ে দেবে।অনেক দূরে চিকন ফিতার মত রূপালী নদী আবছা আবছা দেখা যাচ্ছিল, নদীর নামটা অবশ্য সে যাত্রায় আর জানা হলনা। মেঘগুলোকে মনে হচ্ছিল ধোঁয়ার দঙ্গল, হাত দিলেই ধরা দেবে। নীলগিরি অবশ্য সৌখিন পর্যটকদের ভিড়ে সারাবছরই সরগরম থাকে, সামনে গাড়ির বহর দেখে সেখানে যে মানুষ দেদার হানা দেয়, সেটাও বোঝা গেল।

DSC04350

DSCF0475

DSCF0457

ক্যামেরাবাজের অভাব নেই!

DSC04378

আগ্নেয়গিরি বলে ভ্রম হয় নাকি?

DSCF0402

এক নজরে বান্দরবানঃ

DSC04430

নীলগিরির পাট চুকোতে চুকোতে দেখি বেলা অনেকদূর গরিয়ে এসেছে। তখনও থানচি যাওয়ার পথের মেলা দেরি, আমরা কেবলমাত্র অর্ধেকের সামান্য কিছু বেশি পথ পেরিয়েছি। তবে খুব শীঘ্রই বুঝলাম, এ দূরত্বটাও দেখতে না দেখতে খতম হয়ে আসবে। চারপাশে তখন শ্বাসরোধ করা দৃশ্য কেবলই বাড়ছে, আর বাড়ছে আমাদের হল্লা-মাস্তি। এর মাঝে একদুবার দেখি গা কেমন ভিজে ভিজে যাচ্ছে, ভালমত ঠাহর করতে দেখলাম, আমরা আসলে মেঘ ফুঁড়ে এগিয়ে চলছি। এরকম বারকয়েক হালকা ভেজার পর মেঘের দলকে পেছনে ফেলে আমরা ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করলাম। তবে সটান নিচে নামা যাকে বলে তা নয়, লাট্টুর মত পাক খেতে খেতে মন্থর গতিতে ড্রাইভার সুকৌশলে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। এর মাঝে আমরা পেরিয়ে আসলাম বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাস্তা পিক ৬৯, সামরিক বাহিনী এই দুর্গম দুরতিক্রম্য অঞ্চলে কিভাবে এই অসাধ্য করেছে কে জানে! এভাবে দেখতে দেখতে বলিপাড়াও পেরিয়ে এলাম। এটাও বেশ বড়সড় একটা পাড়া, শুনেছি এদিক দিয়ে নাকি কেওক্রাডং যাওয়ার একটা পথ আছে, তবে সেটা বেশ ঝক্কির,বিপদসংকুলও বটে। দেখতে দেখতে আমরা থানচির কাছাকাছি চলে এলাম। চাঁদের গাড়ির পাট চুকালো বলে।

Wednesday, November 10, 2010

এবার কাণ্ড খাগড়াছড়িতে-১

পাহাড়পুরেও কিউই! :

কাননবিলাস সেরে সবে চা-পান করে মনমেজাজ তোফা হয়ে গেল, ওদিকে তখন বেলাও প্রায় গড়িয়ে এসেছে, তাই পঞ্চপাণ্ডবের চকিত সিদ্ধান্ত, এবার শহরের ধার থেকে একটু হাওয়া খেয়ে আসা যাক। অটোমামাকে বলতেই তিনি কিছু পথঘাট ঘুরিয়ে আমাদের একটা বেশ খোলামেলা জায়গায় নিয়ে গেলেন। তখন যাকে বলে আসলেই"বৃষ্টি শেষে রুপালী আকাশ", বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছিল। দেখলাম, জায়গাটাতে গরু-টরু বেশ নির্বিবাদে চরে বেড়াচ্ছে। একজনকে জায়গার নাম শুধাতেই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। এই (প্রায়) মগের মুল্লুকে এসেও কিউইদের দেখা পাব ভাবিনি। আচ্ছা খোলাসা করেই বলি, বেশ অনেককাল আগে জনৈক প্রবাসী এই স্থানে এসে বলেছিলেন, আরে এ জায়গা তো দিব্যি নিউজিল্যান্ডের মতো ঠেকছে। সেই থেকে জায়গার নাম হয়ে গেল নিউজিল্যান্ড। তখনো শার্দুলদের হাতে পোড়াকপালে কিউইদের ধবলধোলাই হতে হয়নি, না হয় আমরা বেধড়ক মজাই পেতাম। তবে এহেন পাণ্ডববর্জিত স্থানে এসে নিউজিল্যান্ড তীর্থের পরম সৌভাগ্য হয়ে যাবে তা কস্মিনকালেও ভাবতে পারিনি। একটা ছিমছাম ক্যাফেও দেখলাম সেখানে আছে, ওমা, সেটার নামও নিউজিল্যান্ড ক্যাফে। আর যাই হোক, ভেট্টোরি এন্ড কোংকে অমন বেদম ঠ্যাঙ্গানির পর এ জায়গায় ঘুরিয়ে আনা উচিত ছিল, অন্তত হোম সিকনেসটা একটু হলেও প্রশমিত হত বৈকি। ঐ ক্যাফেতে হালকা পেটপুজো সারতে সারতেই দেখি, আলো বেশ মিইয়ে এসেছে। সেদিনকার মত সফরের তাই সেখানেই সমাপ্তি।

ধবলধোলাইয়ের দেশ নিউজিল্যান্ড

40452_1367366901356_1147195504_30874879_7587762_n

ক্যাফেতে বৈকালিক আহার
39103_1532904969915_1453524600_1413452_2440458_n

আলীবাবার গুহায় পাঁচ চোর:

আগেররাতে পাহাড়ি মুরগী ভুনা, কুচো চিংড়ি দিয়ে শশা আর মাছ ভাজা দিয়ে গলা পর্যন্ত উদরপূর্তি করার ফল হিসেবে পরের সকালে আমাদের ঘুম ভাংল ম্যালা দেরিতে। অথচ, সফরের মোদ্দা অংশটাই তখনও বাকি। তড়িঘড়ি করে হালকা প্রাতরাশ সেরে আমরা আলুটিলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। খাগড়াছড়ি মানেই আলুটিলা, এমন একটা ধারণা বহুকাল আগে থেকেই আমার মাথায় জেঁকে বসেছিল। আলুটিলা গুহায় ঢোকার মুখে দেখি মশালটশাল বিকিকিনি হচ্ছে। ভরা বর্ষার মৌসুম, বৃষ্টি থেকে থেকে ভিজিয়ে দিছিল, তবে সেটা উৎপাত মনে হয়নি মোটেও। আমরা কজন ছাড়া এমন বিটকেলে সময়ে সেখানে আর কোন ট্যুরিস্ট দলের নামনিশানাও ছিলনা। যাক ভালই হল, ভাবলাম আমরা, বেশ প্রেমসে গুহাটা চেখেচুখে দেখা যাবে। তবে অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার গন্ধটা মিলিয়ে যেতে দেরি হলনা যখন দেখলাম গুহার প্রবেশমুখ অবদি রীতিমত শান বানানো সিড়ি। বুঝলাম, প্রমোদভ্রমণপিপাপুদের জন্যই মূলত এই ব্যবস্থা। তবে ভয় একটা ছিলই, সেটা ছিল জোঁকের। জোঁকসংহারের জন্য লবণও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এসব আঁটঘাট বেঁধে কা তব কান্তা বলে গুহায় ঢুকে পড়ি। ভেতরে একরত্তি আলো নেই, পানি কেটে এগুতে হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেটা খুব ধর্তব্যের মধ্যে নয়। মনে করেছিলাম, আর কিছু না হোক, নিদেনপক্ষে একটা দুটো রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার না হলে কি চলে? এমনিভাবে মিনিট দশেক ঘোরার পর সামনে দেখি মিহি আলো চুইয়ে পড়ছে। যাব্বাবা, গুহায় ঢুকতে না ঢুকতেই শেষটা দেখে ফেলেছি, তাহলে আর মজাটা রইল কই? মশালটশাল নিয়ে বেশ একটা থ্রিল ফিল করছিলাম, বেমক্কা সূর্যের আলোর নিচে এসে আমরা একে অন্যের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইলাম। একি হল, গুহায় ঢোকাই হল সার, আর জোঁকের জুজুতে খামোখাই কুঁকড়ে ছিলাম, জোঁকের পাত্তাই নেই।

আলীবাবার গুহায়-

39103_1532905129919_1453524600_1413456_3653382_n

ঝর্ণা কিন্তু পাহাড়ের কান্নাই বটে:

আলুটিলার সম্ভাব্য রোমহর্ষক সফর এভাবে মাঠে মারা যাওয়ার পর আমরা কেউ কেউ নখ কামড়াচ্ছিল, আর বাকিরা সুখটান দিচ্ছিলাম। মনটা তখন ভীষণ দমে ছিল। হঠাৎ আমাদের চা-সিগারেট সরবরাহকারী মামার মুখে শুনলাম, আলুটিলা থেকে আরেকটু সামনে গেলে একটা ঝর্ণা দেখতে পাওয়া যায়। আমরা তখনই যাওয়ার জন্য দুপায়ে খাড়া। সুলুকসন্ধান করে জানলাম, আলুটিলা থেকে বাসে মিনিট বিশেক যাওয়ার পর একটা জায়গায় নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে পদব্রজে আরো দুই-আড়াই কিলো হাঁটার পর রিছাং ঝর্ণার দেখা মিলবে। তেতে ওঠা মেজাজটা তখন একটু ঠান্ডা হওয়া শুরু করেছে। লোকাল বাসের পা-দানিতে কোনমতে পা রেখে দেখতে না দেখতে আমাদের বাস সটান নামিয়ে দিয়ে গেল। এরপর হাঁটার পালা, তবে সেটাও বেশ চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, আমাদের তাকতেরও বেশ পরীক্ষা হয়ে যাবে। হাঁটার সময় দেখি দূর পাহাড়ে জুম চাষ হচ্ছে,আবার হলুদ না আদা চাষ করা হচ্ছে সেটা নিয়েও আমাদের দুবন্ধুর একপ্রস্থ বাহাস হয়ে গেল। ওদিকে মাঝে খাড়া পাহাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের জিভ বেরিয়ে পড়ল। দম নেওয়ার জন্য একটি ঘরে খানিক বসার দেখি, এতো ছোটখাট দোকানই বটে। এহেন কুস্থানে মিনারেল ওয়াটারের বোতল দেখে আমাদের ধড়ে আসলেই প্রাণ ফিরে এল। তবে ঝর্ণার কাছাকাছি আমরা প্রায় এসে পড়েছি। আর কিছুদুর হাঁটতেই দেখি সামনে কিসের কুলকুল শব্দ শোনা যাছে। মোটামুটি পড়িমরি করেই পরের সিড়িগুলো আমরা ভাঙ্গতে শুরু করলাম। ইয়াহু! রিছাং ঝর্ণায় পৌঁছে গেছি।

যাত্রা তবে শুরু হোক...

39103_1532905649932_1453524600_1413469_7455060_n

যেখানে জিরিয়েছিলাম দুদণ্ড

39103_1532905369925_1453524600_1413462_7762065_n

রিছাং ঝর্ণা একটু আজব কিসিমের, অনেকটা ওপর থেকে ঝর্ণা সশব্দে পড়ছে। আর সেই পানি খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের জলাশয়ে এসে পড়ছে। ঠাহর করে দেখলাম, আরে পাহাড়ের মাথায় উঠে তো স্লাইড দিয়ে নিচে নামা যায়, কোথায় লাগে এর কাছে ওয়াটার ওয়ার্ল্ডের বালখিল্য রাইড। তবে ওপরে উঠতে গিয়ে বুঝলাম, কাজটা সহজ নয় মোটেও। এখন সূর্য তেতে উঠলেও খানিক আগের বৃষ্টিতে পাথুরে পাহাড়ের ঢাল বিপজ্জনক রকমের পিচ্ছিল, আমাদের এক কমরেড উঠতে না উঠতেই একেবারে পপাত ধরণীতল। তাও রক্ষে, গোড়ার দিকে হয়েছিল সে যাত্রা বড় কোন অঘটন ঘটেনি। আমিও বারকয়েক আছাড় খেতে খেতে শেষমেশ ইস্তফা দিলাম। ওদিকে আরেকজন কিন্তু তখন রীতিমত আমাদের কাঁচকলা দেখিয়ে স্লাইড দিতে শুরু করে দিয়েছে। তবে আমরা কজন রণে ভঙ্গে দিয়ে নিচেই নেমে আসলাম। নিচে এসে দেখি এখানেও জলকেলির দারুণ বন্দোবস্ত। ঝর্ণার তীব্র জলে গা এলিয়ে দিয়ে আমরা হুটোপুটিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। গাত্র-প্রক্ষালণ শেষ, এবার ফেরার পালা।

জলকেলি!

38930_1367381221714_1147195504_30874972_5834575_n

মুখ ভার করে থাকা আকাশ

39103_1532905689933_1453524600_1413470_7712217_n

ফেরার পথটা আমাদের সহ্যশক্তির চুড়ান্ত পরীক্ষাই নিয়েছিল। সকালের এক পশলা বর্ষণের পর সূর্য তখন সক্রোধে মাথার ওপর চড়ে বসেছে। খানিক আগেই গোসল সেরেছি, কিন্তু এর মাঝেই ঘামে জামা ভিজে জবজব করছিল। তারওপর ক্রমাগত চড়াই-উৎরাই পেরুনোর হ্যাপা তো আছেই। ওদিকে দুকিলো পথকে মনে হচ্ছিল দুইশ মাইল রাস্তা। এইভাবে কোনমতে চলতে চলতে আবার পানিপানের বিরতি নিয়ে একটু ধাতস্ত হলাম। আমাদের ফেরার কথা আলুটিলা থেকে, বাসের সময় ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। ওদিকে পাদুটো মারাত্মক টনটন করছে, আর ছুঁচোগুলো পেটের ভেতর ডন বৈঠক দিচ্ছে। পাহাড়ের ওপর একটা রিসোর্টে ডিমভাজা, বাঁশের তরকারি আর পরাটা দিয়ে ঝটপট উদরপূর্তি সেরে নিলাম( তবে সাধু সাবধান, ও জায়গায় খাবারের বিল দেখে পাহাড় থেকে বেঘোরে পড়ে গেলে আমায় দুষবেননা যেন)। আকাশ তখন আবার কালো করেছে, একটা তুমুল ঝটকা এলো বলে। ওদিকে আমাদের বাসও এসে পড়েছে, ফের পড়তে শুরু করেছে বৃষ্টিও। আর মাটিরাঙ্গার উঁচুনিচু পথ পেছনে ফেলে আমরা চলেছি চাঁটগার পানে।

Thursday, November 4, 2010

নোলানের খোয়াবনামা

১.

স্বপ্ন নিয়ে কাঁটাছেড়া এ পর্যন্ত নেহায়েত কম হয়নি, কিন্তু সত্যি করে বললে তার কতটুকুই বা আমরা জানি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বলা যায় স্বপ্নের কথা প্রায়ই আমার মনে থাকেনা, আর যেটুকুও মনে থাকে সেটুকুও বোধহয় অনেকটাই আটপৌরে। কোন উঁচু স্থান থেকে নিচে পড়ে যাওয়া, পরীক্ষার হলে সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে অথচ একটি প্রশ্নের উত্তরও ঠিকঠাক দিতে পারছিনা বা কোন কিছু আমাকে তাড়া করছে, আমি ক্রমাগত ছুটছি- এসব স্বপ্নই ঘুরেফিরে আমার ঘুমে হানা দেয়। মজার ব্যাপার হল, আচমকা যখন ঘুম ভেঙ্গে যায় তখনই স্বপ্নটা মাথায় গেঁথে থাকে। একটু তলিয়ে দেখতে গিয়ে জানলাম, আমাদের ঘুমের একটা সুনির্দিষ্ট স্তরেই এই স্বপ্ন দেখার কাজটা ঘটে। এই স্তর আবার ঘুমের মাঝেই বেশ কবার ঘটে থাকে। তো এই পর্যায়ে এসে যখন ঘুমটা কেঁচে যায় তখনই ওই স্বপ্নটা ছাপ রেখে যায়। এজন্যই বোধহয় আমাদের সুখস্বপ্নগুলোর স্মৃতি খুব একটা মনে থাকেনা, অথচ দুঃস্বপ্নের স্মৃতি সবারই কমবেশি থেকে থাকে।

২.

স্বপ্নের নিখুঁত ঠিকুজির সুলুকসন্ধান বিজ্ঞানীরা এখনো ঠিক পাননি, এক্ষেত্রে আবার নানা মুনির নানা মত। কেউ কেউ এমনকিও একথাও ঠাউরে থাকেন, স্বপ্ন আদপে এক ধরনের ঐশীবাণীই বটে। তাদের মতে, স্বপ্নই এক অজানা জগতের সাথে আমাদের যোগাযোগের চাবিকাঠি। এমন দাবি হয়তো অনেকের কাছেই কষ্টকল্পনা ঠেকবে, কিন্তু ওবিই বা আউট অফ বডি এক্সপেরিয়েন্সের কথা মাথায় রাখলে এক লহমায় এ দাবি উড়িয়ে দেওয়া যায়না। অনেকেই হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কাজগুলোর অনুভূতি অনেকসময় স্বপ্নে বেশ প্রকট হয়ে ওঠে। ধরা যাক, আপনি স্বপ্নেই কোন জায়গা থেকে পড়ে যাচ্ছেন, ওই মুহুর্তে কিন্তু আপনার অনুভূতি পুরোটাই ভয়াবহ রকমের জান্তব, অথচ পুরো ব্যাপারটাই কিন্তু আপনার ঘুমের মাঝেই ঘটছে। দেহ থেকে আত্মার এই সাময়িক বিচ্ছেদের সময় এই ধরনের অভিজ্ঞতার গোমরটা আসলে তাহলে কোথাও? এই প্রশ্নের উত্তরও ব্যাপকই ঘোলাটে, এ বিষয়ে গবেষণা এখনও জোরেসোরে চলছে, তাই বিভিন্ন তত্ত্বের কথা বলা হলেও একেবারে চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা এখনো কোনটি পায়নি। কেউ কেউ বলে থাকেন, আমাদের চেতনা দেহ থেকে ভিন্ন একটি সত্ত্বা বা বলা ভাল দেহবিহীন চেতনা এবং চেতনাবিহীন দেহ দুই-ই সম্ভব। এই জন্যই দেহবিচ্ছিন্ন হয়েও স্রেফ আমাদের চেতনার কারণে আমরা স্বপ্নের মাঝেও স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শের মত অনুভূতিও পেতে পারি। তবে এটা একটা থিওরি মাত্র, এরকম এন্তার থিওরি আছে এবং সেগুলো নিয়ে আগাপাশতলা ব্যবচ্ছেদ আজ অবধি জারি রয়েছে। আরেকটা কথা বলে রাখা ভাল, স্বপ্ন পারলৌকিক বা অন্য জগতের সাথে মেলবন্ধনের যোগসূত্র এমনটা যারা ভেবে থাকেন, তাদের মতে স্বপ্ন আসলে জাগরণেরই বিকল্প একটি রুপ। কিন্তু এই যুক্তি খোঁড়া মনে হয় একারণে যে , স্বপ্ন আসলে অবচেতন মনেরই একটা দশা মাত্র, আর স্বপ্নের সময় আমাদের ব্রেইনের সংকেতগুলো এ ধারণাই দেয়।

৩.

একটা মজার ঘটনার কথা বলি। আমাদের এক বন্ধু বলছিল তার স্বপ্নের কথা। মাসতিনেক আগে সে স্বপ্ন দেখে সে কয়েকজন অচেনা ছেলের সাথে একটা হোটেলের কামরায় আড্ডায় মশগুল। ঐ সময় আচমকা তার ঘুম ভঙ্গে যায়। পরে তার রুমমেটকে সে ওই স্বপ্নের বয়ান দেয়। মজার ব্যাপার হল, ঠিক কদিন আগে আমাদের বান্দরবান ট্যুরে ঐ বন্ধুই আরো কজনের সাথে এক কামরায় রাত কাটায়। বলাই বাহুল্য, তাদের পরিচয়টা ওই ট্যুরেই পয়লা ঘটেছিল। স্বপ্নের অলোকদর্শন ক্ষমতার এমন নজির খুব বেশি বিরল নয়। আর এ ধরনের প্রোফেটিক স্বপ্নের জন্যও স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন উদ্ভট থিওরি হালে পানি পেয়ে যায়। অলোকদর্শন (যদি ব্যাপারটা আসলেই থেকে থাকে) স্বপ্নের একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষংগ, সমস্যা হল নিতান্তই কাকতাল বলে এ ধরনের স্বপ্নকে হয়তো কনফার্মেশন বায়াস বা অন্যকোন পরিসংখ্যানের গেরোয় ফেলে দিয়ে দিব্যি নাকচ করা যায়, তাই বলে ব্যাপারটা কি আদতেই এক লহমায় উড়িয়ে দেওয়া যায় কি?

৪.

বলতে দ্বিধা নেই, স্বপ্ন নিয়ে এসব ভাবনার খোরাক পয়লা পাই গুনী ফিল্মমেকার ক্রিস্টোফার নোলানের সাম্প্রতিকতম ছবি "ইনসেপশন" দেখার পর। প্রেস্টিজ, মেমেন্টো, ডার্ক নাইটের মত বহুল পরিচিত বা ফলোয়িং এর মত স্বল্প পরিচিত সিনেমাগুলো দেখার পর এমনিতেই নোলানের ভক্ত বনে গিয়েছিলাম, তাই ইনসেপশন নিয়ে কৌতূহলের পারদটা খুব চড়াই ছিল। হাতের কাছে পাওয়া মাত্র দেখে ফেলতে তাই কসুর করিনি মোটেই। সিনেমাটি তুঙ্গে ওঠা সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছে কিনা এমন সওয়ালের জওয়াব দেওয়ার আগে স্বপ্ন নিয়ে নোলানের চিন্তাভাবনাটা একটু বলা দরকার। ইনসেপশনের ধারণা নোলান অনেকদিন ধরেই পেলেপুষে বড় করেছিলেন, তবে ঠিক কীভাবে এটাকে ফুটিয়ে তুলবেন সেটা নিয়ে শুরুতে তার মনে একটু দ্বিধাই ছিল। ভাবনাটা দানা বাঁধতে শুরু করে যখন নোলান এমন একটা জগতের কথা কল্পনা করেন যেখানে সবার স্বপ্নগুলো একটি অবিচ্ছিন্ন স্বপ্নরাজ্যে মিশে একাকার হয়ে আছে। সম্পূরক চিন্তা হিসেবে তার মাথায় তখনই আসে, আরে তাই যদি হতো, তবে স্বপ্ন নিয়ে নয়-ছয়ও হতে পারে বৈকি। মোদ্দা কথা হল, ইনসেপশনের মূল যে বুনিয়াদ, অর্থাৎ স্বপ্নচুরির আইডিয়া তখনই তার মাথায় আসে। নোলানের এই স্বপ্নবাজি শুরু হয় ষোল বছর বয়েসে, যখন এক ল্যুসিড ড্রিমের পর তার মাথায় এই চিন্তা আসে। নোলান অবশ্য বলতে কসুর করেননি, বোর্হেসের লেখা পড়ে তিনি এই দুরুহ কাজে হাত দিতে বেশ ভাল রকমের প্রণোদিত হন।

বলা যায়, এই ভাবনা অঙ্কুরিত হতে বেশ সময় নিয়েছে। গোড়ায় তো নোলান ভেবেই রেখেছিলেন ম্যুভিটা হবে ভৌতিক আবহের। কিন্তু হরর ম্যুভিগুলোর সেই চিরকালীন সমস্যা- আবেগ বা অনুভূতিগুলো শেষমেশ খেলো হয়ে যাওয়ার কারণে এই ধারণা থেকে তিনি সরে আসেন। এইখানে অবশ্য আমি নিজে নোলানকে বাহবা দেব, কারণ স্বপ্নের মত একটা দুর্বোধ্য ভাবনা লালনা করার জন্য হরর ব্যাকগ্রাউন্ড আদপেই ঠিক যুতসই হয়না। এভাবে বছর দশেক ব্যয় হয় স্ক্রিপ্টটাকে ঠিকঠাক করে মূল ব্যাপারগুলোকে একসুতোয় গাঁথার জন্যে। এটাও মেলা আগের কথা, ঠিকঠাক বললে ২০০১ সালের দিকে। তবে তখনই ঠিক করেন সিনেমাটা তিনি রয়েসয়ে বড়সড় বাজেট নিয়ে বানাবেন। স্বপ্নে কিন্তু মানুষ এক নিমেষে অসাধ্য সাধন করতে পারে, আর মানুষের মনের ক্ষমতার দৌড় কদ্দুর, তা নিয়ে আজ অবধি কোন সঠিক মাপজোখ পাওয়া যায়না। শেষমেশ নোলান ঠিক করেন, স্বপ্ন নিয়ে কারবার করতে হলে বিশাল একটা স্কেলেই কাজ করা সমীচীন। আজ তাই দীর্ঘদিনের স্বপ্নবাজির ফসল আজকের ২০১০ সালের ইনসেপশন।

৫.

যাই হোক, একজন দর্শক হিসেবে যদি বলি, সিনেমাটা দেখতে গিয়ে কোথাও টাল খেতে হয়নি, পুরো সময়টা জুড়েই রোলারকোস্টারে চড়ার মত একটা টানটান উত্তেজনার স্বাদ পেয়েছি, একথা বলতেই হবে। তবে স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন ব্যাপারটা আমাকে আসলেই তাজ্জব করে দিয়েছে। স্বপ্নের ভেতর আরেকটা স্বপ্নের কথা না হয় মানা গেল, কিন্তু তার ভেতরেই আরেকটা স্বপ্ন? ব্যাপারটা কিঞ্চিত ঠাহর করতে পারতেই আমার মাথায় যে প্রশ্নের উদয় হল, এই দ্বিতীয় স্তরের মাঝেই আরেকটা স্তরও কি অসম্ভব? আদতে নোলান কিন্তু তাই দেখালেন, আর এটাই দর্শকের একটা পেলব অনুভূতির রেশ কাটিয়ে মাথার ভেতর ভাবনার ঝড়ে বইয়ে দেওয়ার নোলানের নিজস্ব কারিকুরি। আর কিছু কিছু ব্যাপার, যেমন স্বপ্নের স্তরগুলোর গভীরতা যতই বাড়তে থাকবে ততই তাদের সময়ের ব্যপ্তিও বাড়তে থাকবে। সোজা কথায় বললে বাস্তবে যখন আমরা ঘুমের যে সময়টুকু নিয়ে স্বপ্ন দেখি, তার স্থায়িত্বকাল কিন্তু খুবই কম। কিন্তু ওই সময়েই স্বপ্নের ব্যপ্তিকাল অনেক বেশি। এ ব্যাপারগুলো মোটামুটিভাবে অনেকের কাছে বোধগম্য, ম্যুভি দেখার সময় কোন জগতটা বাস্তব আর কোন জগতটা স্বপ্নের, আর স্বপ্নের হলেই এর কোন স্তরের এ নিয়ে কোন খটকায় অন্তত আমাকে পড়তে হয়নি। তবে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, স্তরগুলো নিয়ে ঘোরতর কুহক নোলান বুঝেশুনেই এড়িয়ে গেছেন, অন্তত এই ক্ষেত্রে তিনি দর্শককে ঘোল খাওয়াতে চাননি চিনি।

একইভাবে স্বপ্ন ছিনতাই বা স্বপ্নের মাঝে আরেকটা ভাবনার বীজ বুনে দেওয়ার ব্যাপারটাও নোলানীয় কারদানিই বটে। স্বপনের ভেতরকার জগতটাকে গড়ে তোলা ও নিয়ন্ত্রণ করার মত বিটকেলে ব্যাপারগুলোও নোলান আশ্চর্য দক্ষতায় দেখিয়েছেন। সিনেমার কাহিনি মূলত এ নিয়েই, ডমিনিক কবের(লিওনার্দো দি ক্যাপ্রিও) নেতৃত্বে একদল কর্পোরেট স্পাইয়ের স্বপ্ন চুরির মিশনের ওপর ভর করেই কাহিনি এগি্যেছে। বলাই বাহুল্য, ব্যাপারটা এত সরল আর থাকেনা, ধীরে ধীরে এক জটিল আবর্তে তারা সবাই বাঁধা পড়ে যায়। তারপর...থাক, কাহিনির বয়ানে আর না যাই, সে গপ্পো পরেও ফেঁদে বসা যাবে। তবে একটা কথা না বললেই নয়, কাহিনিতে কবের স্ত্রী মলের(ম্যারিওন কোটিয়ার্ড) ভূমিকা শুরুতে খুব একটা প্রকট না থাকলেও শেষমেশ কিন্তু এই চরিত্রটির উপস্থিতি আলাদাভাবে ঠাহর করা গেছে। আর যে বারদুয়েক আমি সামান্য সময়ের জন্য ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম, সেটাও ওই মলকে নিয়ে তৈরি করা ধোঁয়াশার কারণেই।

সত্যি করে বললে , সিনেমাটির অসাধারণ কন্সেপ্ট বাদ দিলে আলাদাভাবে উচ্চকিত হওয়ার খুব বেশি কিছু বোধহয় নেই। সিনেমার একেবারে শেষের দৃশ্যের হালকা রহস্য ছাড়া তব্দা খেয়ে যাওয়া নোলানীয় মোচড়ও দেখা পাওয়া ভার, তবে আমার নিজস্ব খেদ থেকে থাকবে এই কারণে এই দুর্দান্ত আইডিয়াটার শেষটা একটু জোলোই হল। স্বপ্নবাজির ব্যাপারগুলো স্তব্ধ করে দেওয়ার মতই ছিল, থ্রিলটাও ছিল পুরোদমে, কিন্তু ওই যে নোলানীয় সিগনেচারটা ঠিক যেন দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। তবে নোলানের আত্মপক্ষ সমর্থনে কিন্তু এই জিনিসটাই চলে আসে, তিনি অকপটে স্বীকার করেন এই সিনেমা দেখতে গিয়ে দর্শকদের কোন জট না ছাড়ানো জটিল ধাঁধার সন্ধান দেওয়া তার অভিপ্রায় ছিলনা মোটেই। তাই নোলান নিজেই যখন বলেন, সিনেমাটা আসলে একটা রোলার কোস্টার রাইড, আর ব্যাপার আসলে একটাই, রাইডটাকে স্রেফ উপভোগ করা- তখন আমাদের আশায় তিনি আক্ষরিক অর্থেই জল ঢেলে দেন। তবে স্বপ্ন নিয়ে আমার ভাবনাগুলোকে উস্কে দেওয়া জন্য নোলান একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন বৈকি।

ফুটনোটঃ শুরুতে স্থির করেছিলাম, ইনসেপশন নিয়ে একটা গোছানো রিভিউই লিখব, পরে রিভিউ লিখতে গিয়ে পাছে বেরসিক স্পয়লার অ্যালার্টের উটকো খপ্পরে পড়ে যাই, সে চিন্তায় ওই প্রজেক্টে ইস্তফা দেই। শেষমেশ পোস্টটা দাঁড়ালো স্বপ্ন নিয়ে কিছু উড়ুক্কু বাতচিতের গপ্পো।

ঢাকার প্রেম

  ‘আমরা তিনজন একসঙ্গে তার প্রেমে পড়েছিলাম : আমি , অসিত আর হিতাংশু ; ঢাকায় পুরানা পল্টনে , উনিশ-শো সাতাশে। সেই ঢাকা , সেই পুরানা পল্টন , সেই ...