Sunday, May 3, 2020

কোয়ারেন্টিনে ফেলুদা


-   


   -আজ মোট কদিন হলো রে, বল তো?

   চট করে উত্তরটা মাথায় এলো না। ইদানীং বারের হিসেবই ভুলে যাচ্ছি, রোব-সোম-মঙ্গল সব একেবারে এক হয়ে গেছে। আগে প্রতি রোববারের সকালটা শুরু হতো শ্রীনাথের চায়ের সাথে, বাবা এরপর বেরিয়ে যেতেন আড্ডা দিতে। এখন বাবাও সারাদিন বাসায় বন্দি। করোনা ভাইরাস আসার পর থেকে আমি আর ফেলুদাও পারতপক্ষে বাসা থেকে বেরুইনি। ফেলুদার একটাই চাহিদা, দিনে এক প্যাকেট করে চারমিনার- ওটার জন্যও নিজে আর বের হয় না। পাড়ার দোকানী সকালে বাসার সামনে এক প্যাকেট করে রেখে চলে যায়। বাসায় সারাদিন বসা, নতুন কোনো কেস হাতে আসার সম্ভাবনা প্রায় শুন্য। আপাতত চারমিনার পুড়িয়েই ফেলুদার দিন কাটছে বেশি।
 -৪৩ দিন, ফেলুদা।
  উত্তরটা দিতে ক্যালেন্ডারের পাতাটাও একটু ওলটাতে হলো। সেই মার্চ মাসে ঘোষণা এসেছিল লকডাউনের। প্রথমে ভেবেছিলাম, কটা দিন কষ্ট করে পার করতে হবে। ওই মুহূর্তে অবশ্য ফেলুদার হাতে নতুন কোনো কেসও ছিল না। চন্দননগরের স্বামী-স্ত্রী খুনের জটিল মামলার একটা কিনার করে এনেছে মাত্র। সেটা নিয়ে কম দৌড়ঝাপ যায়নি। খুনী বলতে গেলে পুরো ভারতবর্ষ ঘুরিয়েছে ফেলুদাকে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য গতি হয়েছে কেসটার। পুলিশ কমিশনার অশোকবাবুও বলছিলেন, ‘এবার মশাই কটা দিন বিশ্রাম করুন। আপনার তো আর বাঁধাধরা চাকরি নয়, আমাদের মতো প্রতিদিন ইউনিফর্ম পরে বাইরে যাওয়ার তো বালাই নেই আর।’ তবে ফেলুদা জানত, আবার কোনো জটিল কেস এলে অশোকবাবুর কাছ থেকে একটা কল আসবেই।
  প্রথম কটা দিন দুজনের মন্দ কাটেনি। ফেলুদা এমনিতে নানান রকম ইনডোর গেমস জানে। এখন তো মোবাইল অ্যাপ থেকে ফেসবুকেও গেমসের অভাব নেই। মাও সেদিন এসে বলছিল, ছোটপিসীরা নাকি অনলাইনে লুডো খেলে। ফেলুদা অবশ্য এতদিন পরেও এসব দিক দিয়ে একটু সেকেলে থেকে গেছে। সে বলে, ওসব অনলাইন গেমসে তার পোষায় না খুব একটা। নানান রকম ধাঁধাঁ আর হেয়ালির নিজে বানায়, আর সেসবের মর্মোদ্ধার করার দায়টা আমার ওপরেই আসে। আগে অবশ্য আমি এসব বুঝতাম না খুব একটা। রয়েল বেঙ্গল টাইগার রহস্যের ‘বুড়ো হয় মুড়ো গাছের’ মতো কিছু বুঝে ফেলার তাকত কেবল ফেলুদারই ছিল। এখন অবশ্য আমার মাথাও খুলেছে একটু, লজ্জা লাগলেও স্বীকার করতে দোষ নেই। আর ফেলুদাকে আজকাল হেঁয়ালির সমাধানের চেয়ে আরেকটু বেশি সিরিয়াস কেসের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। সেদিন আফসোস করতে করতে ও বলছিল, ‘বুঝলি তোপসে, এখন আর মাথা খেলানোর মতো কেস খুব একটা পাই না। বাক্স রহস্যতে যেরকম সাদামাটা একটা বাক্স-বদল থেকে অমন গুপ্তধন বেরিয়ে এলো বা ছিন্নমস্তার অভিশাপে একটা ডায়েরি থেকে হেঁয়ালির রহস্যভেদের যে আনন্দ- ওরকম কেস এখন আর পাওয়া যায় না। এখন সবই খুন-জখমের মতো মোটা দাগের মামলা। সেসবে মাথাখেলাতে হয় বটে, কিন্তু পরিশ্রম তাতে যতটা না, তৃপ্তি অতটা নেই।’
  ফেলুদার কথাটা অবশ্য ঠিক। এখন যুগও পালটে গেছে। অপরাধের ধরন বদলেছে অনেকখানি। এই ক্রিকেট খেলাটা ও এতো ভালোবাসে, সেই ক্রিকেটের পাঁক ঘেঁটেই তো ওকে ম্যাচ-ফিক্সিংয়ের একটা তদন্তে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। একটা দুর্বোধ্য হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা বুঝতে না পারায় ফোন এসেছিল অশোকবাবুর মাধ্যমে ওপরমহল থেকে। পরে তো ফেলুদার মাধ্যমে গোটা একটা চাঁই ধরা পড়ল ফিক্সিং-কেলেংকারির। তাতে কয়েকজন জাতীয় ক্রিকেটারও জড়িয়ে পড়ছিল। ফেলুদাই আফসোস করতে করতে বলছিল তখন, ‘ক্রিকেটটা আর ক্রিকেট নেই রে।’
  ক্রিকেট থাকলেও সময়টা পার করা যেত। টিভিতে পুরনো দিনের খেলা কিছু দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু শুধু তা দেখে কি আর সময় কাটে? এদিকে কলেজে অনলাইন ক্লাস হচ্ছে বটে, কিন্তু এরপর তো বাকি সময় পড়ে আছে। বন্ধুদের সাথে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক করে আর কত সময় কাটে? ইনস্টাগ্রামের মেমোরিতে প্রথম কদিন থ্রোব্যাকথার্সডে হ্যাশট্যাগ দিয়ে গ্যাংটক আর কাঠমান্ডুর ছবিও দিলাম। কিন্তু আপাতত পুরনো ছবি দেওয়ার ইচ্ছাও মরে গেছে। ফেলুদা প্রথম দুই সপ্তাহ বেশ ফুর্তিতেই ছিল। অনেক দিন আলসেমিটা একদম তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল। ওর তো সোশ্যাল মিডিয়ায় অত আগ্রহ নেই, টুইতারেই যা একটু ঢুঁ মারে মাঝেসাঝে। সিধু জ্যাঠার কাছ থেকে বেশ কিছু বই আনিয়ে রেখেছে আগেই, আর নিজের কিন্ডলে আরও বিস্তর বই আছে। সেগুলোই পড়ছে ও। আর সময় পেয়ে পুরনো কিছু ভালো ছবি দেখে নিচ্ছে। ওর শুরুর দিকের কেস সোনার কেল্লা নিয়েই সিনেমা করার কথা হচ্ছে, মানিকবাবু নামে এক লোক এসে কথাও বলে গিয়েছিলেন সেদিন। আপাতত ফেলুদা আগাথা ক্রিস্টির মার্ডার অ্যাট ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস দেখছিল। আর সেদিন নেটফ্লিক্সে নতুন ডিটেকটিভ ছবি ‘নাইভস আউট’ দেখতে দেখতে বলছিল, ‘ছবিটার প্লটে যতই ফুটো থাক, ডিরেক্টর নাটাই থেকে সুতো ছেড়েছেন খুব ধীরেসুস্থে।’
   কিন্তু এখন ফেলুদাও খানিকটা অধৈর্য। নতুন কেস কবে আসবে ভরসা নেই। বিরক্ত হয়ে আমাকে কী যেন একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
  ‘আরে, লালমোহনবাবু যে? দুই দিন তো খবর নেই।’
  ওপাশ থেকে লালমোহনবাবু এমন চেঁচিয়ে কথা বলছিলেন আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলুম।
‘ -আর বলবেন না মশাই, এভাবে তো আর পারা যাচ্ছে না। বাসায় বসে থাকতে থাকতে তো হাঁপিয়ে উঠলুম। এভাবে কি বাস করা যায় নাকি? ভক্তদের সঙ্গে ফেসবুক লাইভ করে-টরে আর কত সময় কাটে? এদিকে বাসায় কথা কইবার মতো কেউ নেই।’
- -কেন, আপনার নতুন উপন্যাসের কাজ এগুচ্ছে না?
--শুরুতে তো তরতর করে লিখে ফেলছিলুম। কিন্তু আমার অভ্যেসটা তো জানেন, কিছুদিন মুক্ত হাওয়ার স্বাদ না পেলে মাথাটা ঠিক খোলে না। আর কিছু না হোক, অন্তত মেমোরিয়ালের দিকে একটা ঢুঁ মারতে পারলেও হতো। এদিকে অবস্থা গতিক দেখে হরিপদকেও ছুটি দিয়ে দিয়েছি। আর আপনি তো জানেন, শিখব শিখব করে গাড়ি চালানোটাও শেখা হয়নি। তো এবারের উপন্যাসটার নামও দিয়েছিলাম মোক্ষম। ‘কারাকোরামে করোনাতংক’- কেমন হয়েছে বলুন তো?
- -নাম তো ভালোই হয়েছে, কিন্তু কারাকোরামে আসলেই করোনা আছে কি না খোঁজ নিয়ে দেখেছেন তো?
- -হ্যাঁ আলবৎ নিয়েছি। এবার একেবারে গুগল সার্চ করে থরো নলেজ নিয়েছি। কিন্তু মশাই সকাল থেকে গলাটা কেমন যেন খুসখুস করছে। এদিকে ফেসবুকে দেখলাম ওপাড়ার ব্রজেন শেয়ার দিয়েছে, সকাল বিকাল থানকুনি পাতা খেলে নাকি করোনা সেরে যায়।
- -ওসবে একদম কান দেবেন না লালমোহনবাবু। আপনাকে তো আগেই বলেছি, ফেসবুকে কোনো কিছু বিশ্বাস করার আগে দুইবার চিন্তা করবেন।
-  -আরে সেটা তো মাথাতেই আছে। কিন্তু বুঝলেন না, এতজন এত কিছু শেয়ার দিচ্ছে। আবার নিচে লিখে দেয়, কালেক্টেড। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা সেটা বুঝে ওঠাই তো মুশকিল! তবে যা বলছিলাম, এবারের উপন্যাসের কাহিনটা দারুণ। প্রখর রুদ্রের বিপক্ষে এবার ডাবল ভিলেন। কারাকোরামের ম্যাফিয়া গ্যাং তো আছেই, সঙ্গে অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাস। কেমন হবে বলুন তো?
-  -ভালোই তো মনে হচ্ছে, শুধু তথ্যগুলো গুগল করে ক্রসচেক করে নেবেন। ফেসবুক থেকে দেখে কিছু লিখতে যাবেন না যেন।
-  -ছ্যা ছ্যা মশাই, কী বলছেন এসব! সাহারায় শিহরণের সেই ভুল কি আর করি? একবার করেই যথেষ্ট শিক্ষে হয়ে গেছে। এবার উইকিপিডিয়ার রেফারেন্স ছাড়া এক পাও নড়ছি না।
-  -তাহলে তো ভালোই। কিন্তু আপনার লাইভ কেমন হচ্ছে ভক্তদের সঙ্গে?
-  -তা হচ্ছে মন্দ নয়। ফেসবুকের সব ব্যাপার স্যাপার তো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি এখনো, মাঝে মাঝে ক্যামেরাটা একটু ইয়ে মানে ওই উলটো হয়ে যায় আর কী। তবে হ্যাঁ, রেস্পন্স ভালো। কালও প্রায় ৫০০ জন একসঙ্গে ছিল। তা আপনাকে এত করে বললুম, একদিন আপনিও আসুন। আমার কথা তো শুনলেন না।
    -নাহ, আমার ওসব লাইভ টাইভ পোষাবে না। সবাই যদি চেহারাই চিনে ফেলে তাহলে গোয়েন্দাগিরি গোল্লায় যাবে। আর এত আলাপ করে কী-ই বা বলব এত?
   -এর মধ্যেই শ্রীনাথ এসে এক পেয়ালা চা দিয়ে গেল। হঠাৎ করেই করে বাবা এসে বলল, ‘ফেলু, তোপসে এদিক আয় শিগগির, জরুরি কথা আছে।’
   -ফেলুদা লালমোহনবাবুকে ‘রাখছি’ বলেই ড্রইংরুমে চলে এলো। আমিও ঢুকলাম পিছু পিছু। বাবার গম্ভীর মুখ দেখে আঁচ করতে পারছিলাম, কোনো একটা দুঃসংবাদ আছে।
-   শোনো, একটা খারাপ খবর আছে। তোমাদের সিধু জ্যাঠাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কদিন থেকেই উনার ঘুষঘুষে জ্বর, একটু কাশিও ছিল। আজ একটু আগে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। এই অবস্থায় তো আমাদের যাওয়ারও উপায় নেই, তবে আমি আমার বন্ধু ডাক্তার অনীশকে বলে দিয়েছি, আশা করি কোনো সমস্যা হবে না।
-   করোনা টেস্ট করা হয়েছে?
-   হ্যাঁ, করা হয়েছে। পজিটিভই আসার কথা, এখন পর্যন্ত লক্ষণ ওরকমই। আমার তো ভেবে অবাক লাগছে, দাদার জ্বর কাউকে জানাননি। এমনিতেই একা মানুষ, তার ওপর এই ঘোর দুঃসময়। ভাগ্য ভালো, প্রতিবেশীরা দায়িত্ববান ছিলেন। নইলে এই সময়ে কেউ কাউকে সাহায্যও করে না! আচ্ছা ঠিক আছে তোমরা যাও এখন। দেখি আমি আরেকটু খোঁজ নিয়ে।
   -নিজের ঘরে এসে ফেলুদা আবারও বিমর্ষ হয়ে গেল। এমনিতে ও ভেঙে পড়ে খুব কম। মৃত্যুকে তো কাছ থেকে কম দেখেনি, কয়েকবার বেঁচে গেছে মরতে মরতে। লালমোহনবাবুর কাঠমান্ডুতে অমন দুর্দশার সময় ছাড়া খুব বেশি চিন্তিতও হয়নি। কিন্তু এবার এমন একটা খবর এলো, যেটার জন্য মানসিকভাবে আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না।
-   তোপসে, সিধু জ্যাঠার সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছে তোর?
-   বাবার সঙ্গে হয়েছিল বোধ হয় সপ্তাখানেক আগে। আমার সঙ্গে তো এর মধ্যে হয়নি।
-   আমি কয়েক দিন থেকে ভাবছিলাম, একটা ফোন দেব। কিন্তু ভাবতে ভাবতে আর দেওয়াই হলো না। এখন ধকলটা কি সইতে পারবে উনি?
-   আচ্ছা ফেলুদা, করোনার কোনো দাওয়াই কি বের হবে না?
  -প্রশ্নটা করতেই ফেলুদা একটু স্তব্ধ হয়ে গেল। আমরা দুজনেই জানি, করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় এখনো কোনো অব্যর্থ ঔষধ আবিষ্কার হয়নি। পত্রিকায় দেখেছি, সব দেশই ভ্যাকসিন বানানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ সফল হয়নি সেভাবে। আর হলেও সেটা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হতে হতে আরও বছরখানেকের অনেক বেশি লেগে যাবে। কিন্তু আপাতত সিধুজ্যাঠার কথাই মাথায় আসছে বেশি। দুজনেই ওঁর কাছ থেকে যে স্নেহ-প্রশ্রয় পেয়েছি এক জনমে সেটা ঋণ শোধ করা কঠিন। আর ফেলুদার প্রতি বিশেষ রকমের টান ছিল তার। নিজের সেরকম কেউ নেই, আমাদেরকেই ছেলেদের মতো দেখতেন। ওঁর কিছু একটা হয়ে গেলে... ভাবতেই পারলাম না আমি। ফেলুদার চিন্তিত মুখ বলছিল, ও সে কথাই ভাবছে।
   ফেলুদা খানিক চুপ করে আরেকটা চারমিনার ধরাল। ততক্ষণে বাবা এসে বলে গেছেন, সিধু জ্যাঠার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। খবরটা জানার পর ফেলুদা অস্থির হয়ে পায়চারি শুরু করতে লাগল।
-   একজনই এই অবস্থায় একটু আশা দিতে পারেন। তোপসে, আমার মোবাইলটা দে।

  ফেলুদা স্ক্রল করতে করতে বলল, প্রোফেসর শংকুর সাথে বেশ কিছুদিন ধরে আলাপ নেই। শুনেছি, কী একটা গবেষণায় অনেক দিন ধরে ব্যস্ত আছেন। আপাতত দেখি ওর কাছ থেকে কোনো টোটকা পাই কি না।
-   প্রোফেসর শংকু, কেমন আছেন? ফেলু বলছিলাম।

  আমিও শুনতে পাচ্ছিলাম ওপাশের কথা।
-   আরে ফেলু, কী খবর। সবাই ভালো তো?
-   না, প্রোফেসর। সিধু জ্যাঠার কথা তো আপনি জানেন, উনি সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। বেশ অস্থির লাগছে।
-   করোনা সাসপেক্ট করছে নাকি?
-   ওই রকমই মনে হচ্ছে। আপাতত আইসিইউতে আছে, কিন্তু এই বয়সে ধাক্কাটা সামাল দিতে পারবে কি না বলা কঠিন। এখন তো করোনায় কোনো ঔষধেই কাজ হয় না শুনেছি, আপনার কাছে কি কোনো টোটকা আছে? অন্তত একটু কাজে দিলেও হয়।  
-   তোমাকে বলতে বাধা নেই ফেলু, আমি গত বেশ কিছুদিন এটা নিয়েই গবেষণা করছি। তুমি তো আমার মিরাকিউরল বড়ির কথা জান ফেলু, সেটা সারাতে পারে না এমন কিছু নেই। কিন্তু এই করোনায় মিরাকিউরলও ফেল মেরে গেছে। আমি গত দুই মাস ধরে নতুন কিছু আবিষ্কার করা যায় কি না এটা নিয়েই পরীক্ষা করছিলাম।
-   ইতিবাচক কিছু পেয়েছেন?
-   হ্যাঁ, এগিয়েছি বেশ কিছুটা। একটা নমুনাও দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু এখনও কারও ওপর প্রয়োগ করা হয়নি বলে বুঝতে পারছি না কেমন কাজে দেবে।
-   সিধু জ্যাঠার ওপর করে দেখতে চান?
-   সেই সিদ্ধান্ত তোমাদের। তবে আমার মনে হয় এই ঔষধে কাজ হবে।
-   আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

  এরপরের গল্প খুব ছোট। সিধু জ্যাঠার ওপর পরীক্ষা করা হলো ঔষধটা, দ্রুত সেরে উঠলেন তিনি। এরপর তো তোলপাড়।  ‘করোনাকিউরল’ বড়ি মানবজাতিকে বাঁচিয়ে দিল আরেকটি মহাবিপদ থেকে, প্রোফেসরকে নিয়ে আরও একবার হইচই। এবার পুরো বিশ্বজুড়েই। এমনিতে ব্যবসায়িক কিছুর জন্য প্রোফেসর শংকু কখনো তার কোনো কোনো আবিষ্কার ব্যবহারের অনুমতি না দিলেও মানবতার খাতিরে তিনি এবার সায় দিলেন। নিজামে মাটন চপ খেয়ে করোনামুক্তির উদযাপন করলাম লালমোহনবাবুসহ আমরা তিন জন। খেতে খেতে লালমোহনবাবু বলছিলেন,
-   বুঝলেন মশাই। এই যে প্রোফেসর শংকু, ভাবছি উনাকে সুপারহিরো বানিয়ে নতুন একটা সিরিজ শুরু করব। ভেবেছ, কীভাবে পুরো বিশ্বকে একা বাঁচিয়ে দিলেন, অ্যাঁ?
-   ভালোই হবে লালমোহনবাবু। শুরুর বইটার নাম আমি দিয়ে দিচ্ছি, ‘গিরিডিতে গণ্ডগোল’।
-    ......



Sunday, March 17, 2019

একটি ভালোবাসাহীনতার গল্প




ভালোবাসার গল্প বলতে পারে অনেকেই, ভালোবাসাহীনতার গল্প বলতে পারে কজন? আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া, পচে গলে যাওয়া আধুনিক সমাজের সেই ভালোবাসাহীনতার গল্পটা বড় নিষ্ঠুরভাবে বলেছেন রাশিয়ান পরিচালক আন্দ্রে জিগিন্সতেভ, তার 'লাভলেস' ছবিতে। রাশিয়ান ভাষায় ছবিটার নাম নেলিবুভ, যেটির অর্থ অবশ্য ঠিক ভালোবাসাহীনতা বলা যায় না, বরং ইংরেজিতে বলা যেতে পারে ‘অ্যান্টি লাভ।’ তবে সেটির আক্ষরিক কোনো অনুবাদ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়ায় আপাতত এই নামেই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

গল্পের শুরুটা ১২ বছর বয়সী আলিয়োশাকে নিয়ে। তার বাবা-মার মাঝে বনিবনা নেই অনেক দিন থেকেই, দুজনেই রয়েছে বিবাহ-বিচ্ছেদের পথে। তার চেয়েও এক কাঠি সরেস হয়ে দুজনেই এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাও। কিন্তু আলিয়োশাকে কার কাছে যাবে, সেটা নিয়ে একদিন দুজনের মধ্যে হয়ে যায় তুমুল ঝগড়া। দুজনের কেউই দায়িত্ব নিতে চায় না তার, বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়ে যাচ্ছে। আলিয়োশা কাঁদতে কাঁদতেই বাবা-মার সেই কুৎসিত ঝগড়া শোনে।

এক দিন পর হঠাৎ মা আবিষ্কার করে, আলিয়োশা বাড়িতে নেই। স্কুল, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশি, বহু দূরে থাকা দাদীর বাসা- কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না তাকে। বন্ধুর সঙ্গে গোপন খেলাঘরেও সে নেই। আলিয়োশাকে খুঁজে বের করার রুদ্ধশ্বাস অভিযানের মধ্যে চলতে থাকে ছবি। রাশিয়ার তুষারমাখা বিষণ্ণ দিনগুলোতে না থেকেও যেন থাকে আলিয়োশা। কিন্তু আসলেই কি তাকে পাওয়া যায়? কী ঘটেছে তার ভাগ্যে? উত্তরটা পেতে অপেক্ষা করতে হয় শেষ পর্যন্ত।

আমাদের সেলফি-সর্বস্ব সমাযে কতটা ঘুণে ধরেছে, দিনে দিনে কতটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি আমরা- এই ছবির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সেই অশনী সংকেত। ছোট্ট আলিয়োশা তো আসলে রূপক, এই অদ্ভুত ভালোবাসাহীন জগতে যে আবেগের কোনো জায়গা নেই, পরিচালকের প্রতি শটে সেটা চাবুকের মতো আঘাত হানতে থাকে দর্শকের বুকে। এক অর্থে আত্মসর্বস্ব আমাদের সবার জন্য ছবিটা একরকম আয়নাই। এই ছবিটা দেখতে আপনার ভালো লাগবে না নিশ্চিতভাবেই, তবে পরিচালক চেয়েছেনও সেটাই। কিছু কিছু ঔষধ যতই তেতো হোক না কেন, সেটা আখেরে খেতে হয়ই।

Friday, March 1, 2019

বানিয়ালুলুঃ কল্পবিজ্ঞানের চেয়েও বেশি কিছু







পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ বানিয়ালুলু (বিজ্ঞান কল্পগল্প) / শিবব্রত বর্মণ



কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন আমরা যাকে বলি, তার মধ্যে কত শতাংশ বিজ্ঞান আর কত শতাংশ কল্পনা থাকবে সেরকম বাঁধাধরা কোনো নিয়ম নেই। বা কল্পবিজ্ঞান মানেই এলিয়েন, স্পেসশিপ, কপোট্রন বা এরকম কিছু জার্গন থাকতে হবে এরকম কোনো দিব্যিও কেউ দেয়নি। আমাদের বাংলাদেশের গল্পে ঘুরে ফিরে এসব অবশ্য চলে আসেই। কল্পবিজ্ঞানে মহাজাগতিক ব্যাপারস্যাপার থাকবেই, সেটা যেন একটা স্বতঃসিদ্ধের মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বানিয়ালুলুতে যে এসব একদমই নেই, তা নয়। তবে ভাবনার অভিনবত্বের কারণে এই বইকে বাংলা ভাষার ইদানীংকার সব কল্পবিজ্ঞান বইয়ের সঙ্গে মেলানোটা অনুচিত হবে।

বইটি কৌতূহলোদ্দীপক আরও একটা কারণে। ব্ল্যাক মিররের মতো আধা ফ্যান্টাসি আধা সাইফাই আমরা যারা দেখেছি, তারা জান বিজ্ঞান আমাদের প্রতিনিয়ত একটা বিষণ্ণতার গভীর ব্ল্যাকহোলে নিয়ে যাচ্ছে। হারিরির বহুল আলোচিত স্যাপিয়েন্সে যেমন বলা হয়েছিল, কৃষিবিপ্লব হচ্ছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় ধোঁকা- খানিকটা তেমন। বানিয়ালুলুর গল্পগুলো সেই বিষণ্ণতার নিনিষ স্কেলে বেশ ওপরেই থাকবে। নাম গল্পটি দিয়ে শুরু বইয়ের। এই গল্পটা সাইফাইয়ের চেয়ে ফ্যান্টাসি বলাই শ্রেয়। এবং এই গল্পে প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি গভীর সার্কাজম আমাদের চোখ এড়ায় না।

তবে বইটা সত্যিকার অর্থে তরতর করে এগিয়ে যেতে থাকে দ্বিতীয় গল্প থেকে। 'জাগার বেলা হলো' স্বপ্ন নিয়ে দুই লোকের কথোপকথনে এগিয়ে চলা বেশ জমজমাট একটা গল্প। যার শেষটা হয়তো আপনি অনুমান করে ফেললেও ফেলতে পারেন, তবে সেটাই তার বাইরেও গল্পটা অনেক বেশি শক্তিশালী। দুই শিল্পী গল্পটা কল্পবিজ্ঞানের একটা চেনা ফর্মুলায় চলেছে, কিন্তু তার মধ্যেও গল্পকারের একটা মুন্সীয়ানা টের পাওয়া যায়। 'ভেতরের আসতে পারি'র রোবোটিক দ্বন্দ্ব বা আরেকটি চেনা ফর্মুলার ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (ফর্মুলাটার নাম বলছি না, সেটা স্পয়লার হয়ে যাবে) উতরে যায় ভালোমতোই। 'দ্বিখন্ডিত' গল্পেও অ্যাবসার্ডিটির রেশটা আছে ভালোমতোই। পরের গল্পটা 'ড মারদ্রুসের বাগান', আমার কাছে এটা বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। ইন্টারনেট ব্রেক করা বা এর শেকড় নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, তাদের ভালো লাগার কথা। 'বহু যুগের ওপার থেকে' গল্পটা অবশ্য ঠিক জমেনি, আবার 'সার্কাডিয়ান ছন্দ' গল্পটা আমার কাছে বেশ অভিনব লেগেছে। 'বুলগাশেম প্যারাডক্স' আর 'মইদুল ইসলামের শেষ তিন উপন্যাস'- চেনা কিছু ফর্মুলা ধরে এগিয়েছে (এখানেও স্পয়লারের আশঙ্কায় বিস্তারিত বলছি না)। তবে থ্রিলারসম রোমাঞ্চে এই দুইটি গল্পই আপনাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবে।

মোদ্দা কথায় মনে হয়েছে লেখকের একটা বহুদর্শী কৌতূহলী চোখ আছে, বিজ্ঞানের সর্পিল জগতটা যিনি কল্পনার রঙিন চশমায় দেখতে ভালোবাসেন। প্রযুক্তির সমস্যাগুলো তাঁকেও পীড়িত করে, খোঁচা দেয়, যে অস্বস্তিটা তিনি ‘ভাইরাল’ করতে পেরেছেন পাঠকের মধ্যে। অনেক দিনের মধ্যে বাংলা ভাষার কলবিজ্ঞান জগতে এই বইটি তাই স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। আর বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখক যেমন বলেছেন, আমি নিজে তাঁর পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় থাকব, ‘অনুসন্ধিৎসা ও সন্তরণমগ্নতায়।’

Friday, February 22, 2019

পদতলে চমকায় মাটি: অস্বস্তির চোরাকাঁটায় অন্তর্যাত্রা

আগেই বলে রাখছি এটা ঠিক কোনো প্রথাগত রিভিউ নয়, বরং তাৎক্ষণিক পাঠপ্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে।
প্রচলিত ধারণা সম্ভবত এটা, একজন লেখকের জন্য প্রথম বই লেখাটা সবচেয়ে কঠিন। তবে আমার কাছে মনে হয়, দ্বিতীয় বইটাই তার জন্য সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। বই অনেকেই লেখেন, হৃদয়ের কথা বলতেও কমবেশি সবাই ব্যাকুল থাকেন। প্রথম বইয়ে সেসবই বলে ফেলা যায় নিঃসংকোচে। তবে দ্বিতীয় বইয়ে সেই বলাতে ভর করতে পারে একটু দ্বিধা, লেখক হয়ে ওঠার পাথুরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলাটাই তখন ভীষণ দুরুহ একটা কাজ।

প্রথম বই হিসেবে সাক্ষী ছিল শিরোস্ত্রাণ কেমন পাঠকপ্রিয়তা হয়েছে, সেটা বলার বোধ হয় অপেক্ষা রাখে না। তবে দ্বিতীয় বইতে আমরা আবিষ্কার করি অন্য এক লেখককে। প্রেক্ষাপটের কারণে এই উপন্যাসে আবেগের তারে টোকা দেওয়ার কাজটা ঠিক সহজ নয়। আগের বইতে তাজউদ্দিন আহমেদের সেই আখ্যানে বঙ্গবন্ধু, শহীদ জননী থেকে শুরু করে আমাদের সব পূজনীয় ব্যক্তিরা ছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিস্তরঙ্গ নদীতে সেই বই পড়লে একটা আবেগের ঢেউ উঠবেই। লেখকের ভাষাও ছিল সেই আবেগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিছুটা তরল। তবে ‘পদতলে চমকায় মাটিতে’ বাঙালি হিসেবে নিজেদের নিয়ে শ্লাঘা বোধ করার মতো এমন কিছু নেই। একজন পাহাড়ি ফুটবলার-লাল পাহাড় থেকে সবুজ মাঠে আসতে যাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে রক্তমাখা পথ, অস্তিত্ববাদের সংকটে ভোগা একজন ভার্সিটিতে পড়ুয়া হীনমন্য যুবক, একজন খ্যাপাটে স্বপ্নবাজ ফুটবল কোচ, আর তাদের ঘিরে কিছু পলায়নপর লোক- ব্যস, এই তো! আগের উপন্যাসের মতো এবার মহৎ বা কীর্তিমান কোনো প্রধান চরিত্র নেই।
তাহলে এই উপন্যাসের ভেতর কী আছে? প্রথম লাইন থেকেই আছে প্রবলরকম একটা অস্বস্তি। ‘কমফোর্ট জোনের’ বাইরে গিয়ে রঙিন চশমাটা খুলে ফেলে অন্য একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। সেজন্য এই বইটা ঠিক চট করে তারিয়ে তারিয়ে পড়ার মতো নয়। সমর কুমার চাকমা, আরিফ, হিমেল , বিজন দেওয়ান বা শামীম আজাদরা প্রতিটা মুহূর্তেই পাঠকের উরুসন্ধি বরাবর কেমন যেন একটা খোঁচা দিয়ে যান। তবে চিন্তাশীল পাঠক সেই অস্বস্তির কাঁটা নিয়েই পড়ে যাবেন, সেটি নিশ্চিত।
খানিকটা পড়তে পড়তেই উন্মার্গিক ঢাকা শহর থেকে সেই যাত্রায় চলে যেতে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে। পর্যটকদের কাছে এই জায়গার এখন অনেক কদর, সাইড়ু, সাজেকের সুবাদে সেখানে এখন চেকিনগুনিয়ার দাপটও কম নয়। এসব বাদ দিয়ে পাহাড়ের ভেতর ট্রেকিং করতে গিয়ে একদম গহীনেও গেছেন অনেকে। নিজেরও কয়েকবার সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটির সুবাদে পাহাড়ের মানুষদের সঙ্গে অল্প বিস্তর সুখ দুঃখের কথা বলেছি। এই উপন্যাসের বেশ কিছু অংশের সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে তাই সমস্যা হয় না। শান্ত সমাহিত জনপদের বাইরেও মরমে মরে যাওয়া যে অন্যতর পাহাড়, সবুজের আড়ালে রক্তে লাল হয়ে যাওয়া পাহাড়ের খবর আসলে আমরা কয়জন জানি? বা জানলেও সেটা আমরা গা করি কজন? ওই তো একুশে ফেব্রুয়ারি এলে হয়তো ওদের মাতৃভাষা নিয়ে এক দুইটা ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করি, এক দুইটা রেপ হলে হয়তো এক দুইটা হ্যাশট্যাগ দিই, লংগদুতে ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হলে হয়তো কিছু স্যাড রিঅ্যাকশন দিয়ে আসি- এই তো। তাও তো ফেসবুক-ইউটিউব এসে কিছু জানতে পারছে অনেকে, আগে তো এসব চাপা পড়ে যেত জলপাই বর্মের আড়ালে।
দুই মলাটে সমর, বিজয় দেওয়ানদের গল্প পড়তে গিয়ে তাই প্রবল একটা ঝাঁকি খাই। এর মধ্যে ফুটবল এসে দুদন্ড শান্তি দেবে বলে মনে হয়, লেখকের বর্ণনায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের প্রতিটি ঘাসও হয়ে ওঠে বাঙময়। তবে দলাদলি, নোংরামি এখানেও আছে, তার ভেতরেই লড়ে যেতে হয় সমর আর শামীমদের। এখানে যেন কিছুটা মতি নন্দীর সেই ফ্লেবারটা পাওয়া যায়। তবে সন্তর্পণে বুঝে যেতে হয়, ফুটবলটা এখানে নিছকই একটা ক্যামোফ্লাজ।
খানিক পড়েই তাই শান্তিপ্রিয়ার জন্য মনটা উতলা হতে থাকে, জানতে ইচ্ছে করে বিজয় দেওয়ানদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হলেও জানে বাঁচতে দেওয়া হবে তো? আনসার আলীদের মতো পাহাড়ে পাকিপনা করনেওয়ালা অনেকে আছেন, তারা কি জুমঘরে আগুন লাগিয়েই যাবেন? এমন অস্বস্তি, চাপা আতঙ্ক আর উদ্বেগের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে পদতলে চমকায় মাটি।
এর মধ্যেই উঁকি দিয়ে যান হারিয়ে যাওয়া সেই কল্পনা চাকমা, বন্দুকযুদ্ধে নিহত রক্তাক্ত মানবেন্দ্র লারমার লাশ। ও হ্যাঁ, এক ফাঁকে দেখা দিয়ে যান পাইপ টানা মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নামের লোকটাও। পাহাড়ের জন্য যাঁর মমতা ছিল অসীম, লোগাং গণহত্যার ঠিক পরে যিনি নিজেই ছিলেন পাহাড়ে। লেখকের করোটিতে ইলিয়াস বেঁচে থাকেন আশ্চর্য সজীব হয়ে। মনোরম মনোটোনাস ঢাকা শহরের বর্ণনায় ইলিয়াসের সেই ছায়া আরও ভালোভাবে টের পাওয়া যায়, চিলেকোঠার সেপাই বা খোয়াবনামার মতোই যেন চাবুক মারতে থাকে পদতলে চমকায় মাটি; আমাদের ভীষণ অস্বস্তিকে সঙ্গী করে, আমাদের চেনা জগতের আরও সব ভণ্ডামির মুখোশ খুলতে খুলতে। এই মানদণ্ডে অন্তত, পদতলে চমকায় মাটিকে তাই উপেক্ষা করা যায় না। কমফোর্ট জোনের বাইরে বেরিয়ে আসার এই চেষ্টা এই সেলফিসর্বস্ব যুগেই বা কম কী?

Friday, January 12, 2018

প্যাটারসনঃ সিনেমা না কবিতা?

অনেক দিন পর একটা ছবি দেখে মনে হলো, সবাই আমাদের চারপাশের লোক। প্যাটারসন যেন জীবনানন্দের ওই কবিতার মতো, যে অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চায় না। জীবন যা চায়, সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছাবার তার সময় আছে, পৌঁছে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার অবসর আছে।

 পেশায় সে পার্টটাইম বাসচালক, ফুলটাইম কবি। তার প্রতিদিনের জীবন একই ছকে বাঁধা, কিন্তু এর মধ্যেই তৃতীয় নয়নে সে দেখতে পায় অনেক কিছু। বাস চালানোর ফাঁকে সে কবিতা লেখে, কিন্তু আরও অনেক না হতে পারা কবির মতো সেই কবিতা কোথাও প্রকাশ করার ব্যাপারে তার সীমাহীন কুন্ঠা। এমনকি তার একটা স্মার্টফোনও নেই। একেবারেই আটপৌরে জীবন তার, কোনোভাবেই তাকে খুব সফল মানুষ বলা যাবে না। এসব কিছুই জীবনানন্দের সঙ্গে মিলে যায়, জীবন শুকায়ে গেলে যাদের করুণাধারায় ভিজতেও ভয় হয়। এই নবীন শতাব্দীর নক্ষত্রের নিচে যারা গভীরভাবে অচল মানুষ। 

পার্থক্য শুধু একটাই, প্যাটারসনের স্ত্রী অন্তত জীবনানন্দের মতো স্বামীর কাব্যপ্রতিভার প্রতি বিমুখ নন। নিয়মিতই তিনি স্বামীকে কবিতা প্রকাশ করতে উৎসাহ দেন। একদিন প্যাটারসন ঠিকই করে ফেলে সে তার কবিতা নিয়ে প্রকাশকের কাছে যাবে। এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিল সবকিছু। কিন্তু এর পরেই একটা ঘটনা সব ওলটপালট করে দিল।


এই পর্যন্ত সিনেমার কাহিনিতে হয়তো নতুন কিছু নেই। কিন্তু অতি পুরাতন গল্পের মতো এই ছবির সঙ্গে কোথাও একাত্ম হয়ে যেতে হয়। জিম জারমুশের ক্যামেরার ভাষা যেন অনেকটা কবিতার মতো, আটপৌরে ঘটনাও যখন প্রসাদগুণে হয়ে ওঠে অসাধারণ। তবে আমার কাছে এই ছবিটা একদমই আলাদা হয়ে থাকবে শেষের দৃশ্যটার কারণে। অ্যাডাম ড্রাইভার সেখানে যা করেছেন, তার চেয়ে ভালো করাও বোধ হয় কঠিন ছিল। সিনেমার ভাষায় যারা কবিতা পড়তে চান, বা কবিতার ভাষায় সিনেমা, তারা ছবিটা দেখতে পারেন। 

Wednesday, April 27, 2016

বৃক্ষবিলাস


বৃক্ষদের রিটায়ারমেন্ট নেই কোনো। নয়টা-পাঁচটার ডিউটি শেষে তাদের বাড়ি ফেরার তাড়া নেই। স্থানুর মতো নিজেদের কাজটা করে যেতে হয় অহর্নিশ। ৫৭ বছর হলেই তাদের জন্য কেউ ফেয়ারওয়েল নিয়ে অপেক্ষা করে না। কেউ তাদের এসে বলে না, স্যার, সারাজীবন অনেক কষ্ট করলেন, এবার একটু বিশ্রাম নিন।


বৃক্ষদের অ্যাকাউন্টে পেনশনের টাকা জমা হয় না। যে আলো হাওয়ায় তাদের বাস, সেই সঞ্চয়ই তারা সারা জীবন ভাঙিয়ে খায়। অশীতীপর হয়েও সেই অ্যাকাউন্টে কখনো টান পড়ে না। বৃক্ষেরা জানে, সৃষ্টির শেষ পর্যন্ত কাজ করে যেতে হলেও তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ফুরোবে না।


নশ্বর মানুষ চেয়েছিল বৃক্ষের মতো হতে। জানতেই পারেনি, কখন তারা মানুষ হয়ে গেছে!

Thursday, December 17, 2015

অর্ধেক কাল্পনিক,বাকিটা ব্যক্তিগত....

শাংগ্রিলা। শুনলেই পুরাণের কোন এক ইউটোপিয়ার কথা মনে পড়ে । কত বছর ধরে মানুষের কল্পনায় বেঁচে আছে ওই শান্ত সমাহিত স্থান। কত জন সেটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু খোঁজাই হয়েছে সার। শাংগ্রিলা মরীচিকার মতো বিভ্রম হয়ে চিরকালই থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এই যুগে এসে শাংগ্রিলা আর কেউ খোঁজে না। “কোথায় শান্তি পাব, কোথা গিয়ে” বলে মানুষ এখন শুধু হাপিত্যেশ করতে পারে। তবে নদীয়ার একটা গ্রামে সেরকম আরেকটি পরম আরাধ্য জিনিস লুকিয়ে আছে। শাংগ্রিলায় যেমন শান্তি আর সুখ মেলে, মোহিনী নামের সেই গ্রামে তেমন মেলে প্রেম। সেখানে গেলেই নাকি প্রেম জিনিসটা বলেকয়েই হয়ে যায়। যারা কখনও প্রেমে পড়েনি, প্রেম কী জিনিস যাদের জানা নেই তাদেরও!

আষাড়ে গল্পের মতো মনে হচ্ছে ?  বাকিটা ব্যক্তিগত ছবিটা দেখলে মোটেই সেরকম কিছু মনে হবে না। প্রমিতও শুরুতে শাংগ্রিলার মতো কিছুই খোঁজ করছিল। মানুষের এত সব সমস্যা, মানুষ আসলে কী চায় ? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে খুঁজতে প্রমিতের মনে হলো, আচ্ছা, প্রেম জিনিসটা কীভাবে হয় ? সবার প্রেম হয় তার হয় না কেন ? সে পেশায় তথ্যচিত্রনির্মাতা, সার্বক্ষণিক সঙ্গী ক্যামেরাম্যান অমিত। ক্যামেরা নিয়েই সে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে।

শুরুটা যেমন “ধুর, বেঁচে থেকে কী হবে” গোছের, একটু একটু করে গল্পটা কুন্ডলী পাকিয়ে আসতে থাকে। শুরুতে দৃশ্যপটে একজন জ্যোতিষ, সেই নরেন শাসমল নামের একজন আধখ্যাপা বুড়োর সন্ধান দেয়। সেই বুড়োর কাছে আছে এক অদ্ভুত গ্রামের হদিস। মোহিনী নামের সেই গ্রামে গেলে প্রেম হবেই। সেই প্রেম যাকে বলে স্বর্গীয়, একবার হলে সে বন্ধন কাটানো অসম্ভব। বুড়ো নিজেও জানে না, কীভাবে সেখানে যেতে হয়। প্রমিত অবশ্য হাল ছাড়ে না। বুড়োর কাছ থেকে তাঁর এক ছাত্রী মল্লিকা সাহার ঠিকানা পায়। সেই মল্লিকাই বাতলে দেন মোহিনীতে যাওয়ার পথ।

ঠিক পথ বললে অবশ্য ভুল হবে। মোহিনীতে যাওয়ার আসলে কোনো পথ নেই। নদীয়ার নাজিরপুর নামের একটা গ্রামে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। সেখান থেকে কেউ একজন এসে পৌছে নিয়ে যাবে মোহিনীতে। খুবই অদ্ভুত কথা। কিন্তু প্রমিতের মাথায় রোখ চেপে গেছে। সে শেষ দেখে ছাড়বেই। অমিতকে নিয়ে সে চলে যায় নাজিরপুরে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আসলেই একজন এসে তাদের মোহিনীতে নিয়ে যায়। কিন্তু ওখানে গিয়ে কি দুজনের জীবনে প্রেম আসে ?  বাকিটা ব্যক্তিগতই থাক।  

অন্য সব মূলধারার হোক, বা মূলধারার বাইরের হোক, এই ছবিটা অনেক দিক দিয়েই আলাদা। অমিতের হ্যান্ডিক্যামের চোখেই পুরো ছবি দেখানো হয়েছে।  পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য এই সীমাবদ্ধতা আগে থেকেই জানতেন। চাইলেই সব দৃশ্য দেখাতে পারবেন না। সেটা মেনেই ছবিটা একটু অদ্ভুতভাবেই এগিয়েছে। যেখানে অমিতের ক্যামেরা আছে, কাহিনি শুধু সেই রেখা ধরেই এগিয়েছে।

এই ব্যাপারটাই কিন্তু ছবির প্রাণ। অমিতের ক্যামেরার বেশিরভাগ ফ্রেমে শুধুই প্রমিত। তার আনন্দ, ছেলেমানুষি, ক্ষোভ, হতাশা সবকিছুই এগিয়েছে ওই ক্যামেরাতেই। ঋত্ত্বিক চক্রবর্তীর মধ্যে কেমন যেন একটা সহজাত ঘরোয়া ভাব আছে। যেটা করছেন, তার মধ্যে যেন কোথাও এতটুকু ছেনালিপনা নেই।

এই ছবির আরেকটি বড় শক্তি সঙ্গীত। এখনকার ক্লিশে হয়ে যাওয়া গিটার, পিয়ানোর টোন থেকে দুদন্ড শ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিয়েছেন প্রদীপ্ত। বাউল গান এসেছে নানা অনুষঙ্গে, সবুজের কাছাকাছি গিয়ে এক হয়ে গেছে একতারার সুর। ধানের শীষের সাথে মিশে গেছে বাঁশির বাঁশরী, পুরো ছবিতেই সুরের প্রাচুর্য থাকলেও সেটা কখনও কানে ধাক্কা হয়ে আসে না। বরং কেমন যেন মধুবর্ষণই করে।

কিন্তু এই ছবিটা নিয়ে আলাদাভবে লেখার একটা কারণ আছে। এখনকার সব ছবিতে যেটার অভাব, সেই প্রাণ জিনিসটা এখানে প্রচুর পরিমানে আছে। প্রদীপ্ত জানেন তিনি কী দেখাতে চেয়েছেন। সেটা কতটুকু পেরেছেন এটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু ছবিটা দেখার পর যেন রেশটা অনেকক্ষণ লেগে থাকে, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের “শেষ হইয়াও হইলা শেষের ” মতো।


ঢাকার প্রেম

  ‘আমরা তিনজন একসঙ্গে তার প্রেমে পড়েছিলাম : আমি , অসিত আর হিতাংশু ; ঢাকায় পুরানা পল্টনে , উনিশ-শো সাতাশে। সেই ঢাকা , সেই পুরানা পল্টন , সেই ...