Sunday, July 6, 2014

জোগো বনিতো কি শুধুই একটা মিথ ?

সুন্দর ফুটবলটা বস্তুটা আসলে কী? এটা কী সোনার পাথরবাটি , তিব্বতের ইয়েতি নাকি পুরাণের ইউনিকর্ন ? আরও সহজ করে বলি, এটা খায় না মাথায় দেয় ? ব্রাজিলের ফুটবলার দিদি ও স্টুয়ার্ট হলনামের একজন টিভি উপস্থাপকের মাথা থেকে প্রথম "জোগো বনিতো" শব্দ দুইটিবেরিয়েছিল। এরপর আমাজন, লাপ্লাটায় কত জল গড়িয়েছে, জোগো বনিতো শব্দ দুইটি এখন হয়ে গেছে ফুটবল পুরাণের অংশ। ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবলের জন্যই এটা বেশি খাটে, কিন্তু কোনো দল সেরকম চোখধাঁধানো ফুটবল খেললেই তাদের নামের সঙ্গে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। "আহা, কী ফুটবল, দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল" - যুগে যুগে জোগো বনিতো দেখে উচ্ছ্বাসে ভেসে গেছেন আমাদের বাবা, তাঁর বাবা, তাঁর বাবা... । আচ্ছা, এতক্ষণ তো ভাবার সুযোগ পেলেন । আগের কথায় ফিরে আসি, সুন্দর ফুটবলের সংজ্ঞাটা কী ?

সোজাসাপ্টা উত্তরটা দিলে এরকম দেওয়া যায়, " যাহা দেখিতে ভালো লাগে তাহাই সুন্দর ফুটবল"। কিন্তু এটা তো খুবই ভাসাভাসা কথা হলো। চোখের দেখায় তো কত কিছুই ভালো লাগে। যার গোলাপ ভালো লাগে তার রজনীগন্ধা ভালো নাও লাগতে পারে। আবার এমা ওয়াটসনকে স্বপ্নে দেখলে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্টকেই বা দেখা যাবে না কেন? কিন্তু সুন্দর ফুটবল কি শুধুই মনোমুগ্ধকর পাসের প্রদর্শনী ? সুন্দর ফুটবল মানেই কি ছোট ছোট পাসে ছড়িয়ে থাকা নান্দনিকতার ক্যানভাস ? জমাট রক্ষণ, বলের জন্য হাড্ডহাড্ডি লড়াই, গোললাইন থেকে ডিফেন্ডারের ক্লিয়ারেন্স, গোলকীপারের উড়ে গিয়ে দুর্দান্ত সব সেভ- এগুলো কি শুধু ছ্যা ছ্যা করার জিনিস ? এর মধ্যে কি কোনো সৌন্দর্য নেই ?

ব্যাপারটা আসলে আপেক্ষিক। জোগো বনিতোর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মোটা দাগে সবাই একটা দলের কথাই বলেন। ১৯৭০ সালের পেলে, জেয়ারজিনহো,টোস্টাও, কার্লোস আলবার্তোদের ব্রাজিলকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দলই বলা হয়। সেই দল আদতে চার ডিফেন্ডার নিয়ে খেললেও কার্লোস আলবার্তো ও এমারেলদো কিন্তু মোটামুটি উইংব্যাকই ছিলেন। রক্ষণটা তাই কমবেশি অরক্ষিতই থাকত। এক গোল খেলে দুই গোল দেব-মোটামুটি এই মন্ত্র জপেই মাঠে নামত ব্রাজিল। সেজন্যই ছয় ম্যাচে সাত গোল খেয়েও ব্রাজিল ১৯ গোল দিতে পেরেছিল।

অথচ এখনকার কথাটা একবার চিন্তা করুন। নেইমার, অস্কারদের ব্রাজিলের কথাই ধরুন, বা মেসি-আগুয়েরোর আর্জেন্টিনা, এই সময়ে এসে অত গোল দেওয়ার কল্পনা করাটাও বাতুলতা। আর্জেন্টিনার উদাহরণটাই একটু খোলাসা করি। মেসি, হিগুয়েইন,ডি মারিয়া, আগুয়েরো- তাদের আক্রমণকে বিশ্বের সেরা হিসেবে রায় দিয়ে দেওয়া যায়। সেই আক্রমণ নিয়ে এখন আর্জেন্টিনা কতটি গোল করেছে? আঙুল গুনেই বলে দিতে পারেন, আটটি। অথচ যে রক্ষণ নিয়ে এত কথা হচ্ছিল, তারাই কিন্তু দুর্দান্ত করছে। কে জানে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে হলে সামনের দুই ম্যাচে হয়তো কোনো গোলই আর দিতে হবে না তাদের। স্পেন কিন্তু গতবার আট গোল করেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। 
তুলনামূলকভাবে ব্রাজিলের রেকর্ডটা বেশি উজ্জ্বল, দশটি গোল করেছে। কিন্তু কেউ মনে হয় তর্ক করবেন না ব্রাজিলের জন্য ফ্রেড, অস্কাররা যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এখন লুইজ, থিয়াগো সিলভারা। কে জানে, আর কোনো গোল না খেয়েই হয়তো ব্রাজিল হয়তো চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে!

"ইনভার্টিং দ্য পিরামিড" বইতে জোনাথন উইলসন ফর্মেশনের বিবর্তন দারুণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। একসময় যখন এগার জনের দলে মাত্র একজন ডিফেন্ডার ছিল, সেখান থেকে সংখ্যাটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত চারে। শুধু এভাবে বললে আসলে পুরো চিত্রটা পরিষ্কার হয় না। আক্রমণের পাশাপাশি এখন রক্ষণে সাহায্য না করলে দলে আপনি কল্কে পাবেন না। ফুটবলীয় ভাষায় ট্র্যাকব্যাক না করলে কোচ আপনাকে ছুঁড়ে মারতে কিছু মাত্র কসুর করবেন না। আজকের যুগে তাই আক্রমণে যতজনই থাকুক, রক্ষণে কিন্তু এগারজনকেই সাহায্য করতে হয়!

২০১২ সালে চেলসির চ্যাম্পিয়নস লিগ রূপকথার পর ইয়োহান ক্রুইফ বলেছিলেন, "এভাবে খেলে জেতার চেয়ে বরং হারা ভালো।" ব্যাপারটা কি আসলেই এতো সরল ? চেলসি যেভাবে জিতেছে সেটা চোখের জন্য দৃষ্টিসুখকর বলার উপায় নেই। কিন্তু তাদের জয়কে কি এতো সহজে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় ? ২০০৪ ইউরোতে গ্রিসের সেই অবিশ্বাস্য জয়েরপর তো তাদেরকে কম সমালোচনা সইতে হয়নি। সেট পিস থেকে হেড করে গোল- অটো রেহাগেলের রেসিপি ছিল ধরাবাঁধা। কিন্তু সীমিত সামর্থ্য নিয়েও ট্যাকটিকসটা দারুণভাবে প্রয়োগ করে দেখানোর জন্য তাঁর কি কোনো প্রশংসা প্রাপ্য নয় ? টেলে সান্তানার ব্রাজিল সৌন্দর্যের সাথে কোনো আপস করেনি ঠিক। ১৯৮২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেই হার এখনও ট্র্যাজেডি হয়ে আছে। কিন্তু দিন শেষে রেকর্ডবুকের পাতা কিন্তু রেহাগেলকেই মনে রাখবে, সান্তানাকে নয়।

সান্তানার কথা যখন উঠলই,ব্রাজিলের ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক। এরপর আরও দুইবার বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল, কিন্তু ঠিক মন ভরানোর মতো খেলা কি কোনোবার খেলতে পেরেছে ? ২০০২ সালে স্কলারি যে কৌশলে জিতিয়েছিলেন,এখন তো সেটা থেকে একটু হলেও সরে আসতে হয়েছে তাঁকে। এই ব্রাজিল যতটা না নেইমারের, ততটাই কিন্তু সিলভা-লুইজদের। শুধু ব্রাজিল কেন, আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।  আর্জেন্টিনার মূল ভরসা ছিল মেসি-ডি মারিয়া-আগুয়েরো- হিগুয়েইন চতুষ্টয়। বিশ্বকাপ জিতলে সবাই মেসির নামই আগেব বলবে, কিন্তু তাতে কি গ্যারাই-রোহো-দেমিচেলিস-জাবালেতাদের কৃতিত্ব এতটুকু কমে যাবে ? ২৪ বছরের মধ্যে যেটা করতে পারেনি, এবার তো দুর্দান্ত রক্ষণের জন্যই সেটা করতে পারল। অথচ আগের কয়েকবারের তুলনায় এই আর্জেন্টিনার খেলা মোটেই দৃষ্টিসুখকর কিছু নয়। তবে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলে কিন্তু এভাবে খেলেই হবে। যে হল্যান্ডকে কেউ গোনায় ধরেনি, তারা এখন শিরোপার স্বপ্ন দেখছে কীভাবে? লুইস ফন গাল সীমিত সামর্থ্য নিয়েও দলকে যেভাবে ট্যাকটিক্যালি সাজিয়েছেন, সেটা যতটা না "সুন্দর ফুটবল", তার চেয়েও অনেক বেশি "কার্যকর ফুটবল"  । একই কথা প্রযোজ্য জার্মানির ক্ষেত্রেও।  "আমরা সুন্দর ফুটবলের সঙ্গে আপস করি না"- এখন বোধহয় কোনো দলই বুকে হাত দিয়ে এই কথা বলতে পারবে না।

এখনতাই "জোগো বনিতোর" নয়, "জোগো এফিকাজ" বা কার্যকরী ফুটবলের যুগ।

Sunday, November 3, 2013

ক্রিকেটের সাথে বেড়ে ওঠা

তখন আমার ছিল হাফপ্যান্ট পরার বয়স। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অ্যাকশন প্র্যাকটিস করতাম, হ্যাঁ, ঠিক এভাবে বলটা ছুঁড়তে হবে! আমাদের দুকামরার ঘরে একরত্তি জায়গাটা চ্ছিল আমার রানআপের জন্য বরাদ্দ। দিনমান কেটে যেত এভাবে। বিকেলে সামনের উঠোনে নাম বেটে খেলা। খুব জোরে বল করা যাবে না, বলটা যে হারিয়ে যাবে! আরেকটা বল, ওরে বাবা, পাক্কা ১৫ টাকা দাম। কে দেবে অত টাকা? 

তখন টিভি বলতে চিনতাম শুধু বিটিভি। ঈদের সময় আনন্দমেলা, শুক্রবার সকালে মনের মুকুরে, দুপুরে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। তখন বাসায় রাখতাম ভোরের কাগজ।  বুঁদ হয়ে পড়তাম টেন্ডুলকার, লারাদের জাদুকরী সব ইনিংসের কথা। ওই যে, সাদাকালো ছবিতে বযাট উঁচিয়ে আছে টেন্ডুলকার! হাতটা ব্যাট বানিয়ে শ্যাডো করতে করতে ভাবতাম, একদিন আমিও...

এমন সময় পড়লাম মালয়েশিয়ায় কিলাত ক্লাব মাঠে আইসিসি ট্রফি হচ্ছে। সেটাতে ফাইনালে উঠলে নাকি বিশ্বকাপে খেলবে। বিশ্বকাপ! তখনো মাত্র জয়াসুরিয়া, কালুভিতারানাদের স্মৃতি চোখে লেগে আছে। সে কি ধুন্দুমার মার!সেই টেন্ডুলকার স্টামড হিয়ে গেল জয়াসুরিয়ার বলে।  আর রিচি রিচার্ডসনের শট তো আম্পায়ারের কানটাই ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেই বিশ্বকাপে খেলবে বাংলাদেশ!

পেপারে-টেপারে কী লিখেছিল এখন আর অতশত মন নেই। হঠাৎ একদিন ছোটমামা এসে পড়ল, বাংলাদেশ হল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে গেছে। এই ম্যাচটা জিতলেই নাকি বিশ্বকাপ। আমার ছোট্ট মনের বিশ্বকাপের আকাশ ছোঁয়ার বয়স তখনো হয়নি।

এমন সময় একদিন হঠাৎ ছুটি হয়ে গেল স্কুল। বিজ্ঞান টিচার এসে বললেন, বাংলাদেশ স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেছে। তার মানে বিশ্বকাপ! আকরাম, বুলবুলদের নামটাম তখন শুনেছিলাম শুধু। আর  একটু একটু পড়েছিলাম পেপারে। বিশ্বকাপে ওঠার আনন্দে আমরা একটা আস্ত টেনিস বল কিনে ফেলি। কোত্থেকে যেন স্কুলে একটা ব্যাটও জোগাড় হয়ে যায়। সেদিন আর আমরা কেউ লারা-টেন্ডুলকার নই, সবাই আকরাম, বুলবুল, নান্নু।

ফাইনাল কেনিয়ার সাথে। সকালে ছোটমামা এসে বলল,চল রেডিওতে খেলা শুনবি। মামাবাড়ির ট্রানজিস্টরটা ছিল মস্ত। সেখান থেকে গমগম করে কার যেন ধারাভাষ্য শোনা যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম, কেনিয়ার ওদুম্বে-টিকোলো নামের দুইজন বেদম পিটুনি দিচ্ছে। আমাদের সবার একটু মন খারাপ হলো। আইসিসি ট্রফিটা কি আমাদের আর জেতা হবে না ?

পরদিন শুনি বৃষ্টির জন্য খেলা আবার শুরু হয়েছে। আবার রেডিওতে কান লাগিয়ে উৎকর্ন হয়ে অপেক্ষা। এবার টার্গেট ছোট, ওভারও অবশ্য কম। কিন্তু সেদিনটা আসলে আমাদেরই ছিল। একেকটা চার হয়, আর আমরা উল্লাসে ফেটে পড়িতে থাকি। শুরুর দিকে এসে আম্মু মুখ ঝামটা দিয়ে যাচ্ছিলেন, ক্রিকেট ক্রিকেট করে ছেলেপেলে সব বরবাদ হয়ে গেল। একটু পর দেখি, আম্মা নিজেই এসে বলছেন, ভলিউমটা বাড়িয়ে দে, রান্না করতে করতে শুনব। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি।

খেলা তখন শেষের দিকে। ধারাভাষ্যকার বারবার বলছেন, ম্যাচে টানটান উত্তেজনা। হঠাৎ চিৎকার, ছক্কা! পাইলট নাকি বল সীমানার ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছে। আনন্দ, রোমাঞ্চের অদ্ভুত এক অনুভূতিতে আমি কাঁপতে থাকি। চলে আসে শেষ বল। এক বলে তখন দরকার এক রান। আমরা সবাই থরোথরো করে কাঁপছি। সবার শুধু দেহটা দেশে, মন ওই কিলাত ক্লাবে। জিতে গেছি, হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন ছোটমামা। আমার একন জানি বিশ্বাস হতে চায় না! যাহ, আমরা টুর্নামেন্ট জিতে গেছি ? আসলেই ? কে যেন একটু পর এসে আমাকে রঙ মাখিয়ে দেয়। জীবনে সেই প্রথমবার রঙ লাগে গায়ে। ক্রিকেট এরপর অবশ্য আরও অনেকবার আমাদের মনে রঙ লাগিয়েছে বটে।

সেই শুরু। এরপর আরও কতোশতো স্মৃতি। বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। বিশ্বকাপের আগে সে কী প্রতীক্ষা। সারাদিন বসে থাকতাম, কখন বিটিভিতে গুডলাক বাংলাদেশ গনিটা দেখাবে। “পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমার ঢেউ বিশ্ব দেখুক... যাত্রা শুভ হোক”... হুনহুন করে গাইতে গাইতে কী যে দারুণ একটা অনুভূতি হতো। তখন আরেকটু সেয়ানা হয়েছি, ক্রিকেটের অন্ধিসন্ধির খবর জানতে শুরু করেছি।

চলে আসল বিশ্বকাপ। একেকটা রানও তখন আমাদের কাছে কত মহার্ঘ্য ! মাঝে মাঝে আবার নান্নুর ব্যাটের কানায় লেগে চার হয়ে যায়। সেসব অবশ্য আমরা টিভিতেই দেখতে পাচ্ছিলাম। ওই যে রক্তমাংসের শান্ত, পাইলট। এর মধ্যেই আবার হারিয়ে দিল স্কটল্যান্ডকে। এরপর পাকিস্তানকেও হারানো, উরেব্বাস! মনে আছে আব্বার বন্ধুরা মিলে একটা মেজবানের আয়োজন করেছিলেন সেই উপলক্ষে।
দুঃখও কী কম দিয়েছে ? ঈদের আগের দিন, আয়েশ করে গ্রামের বাড়িতে বসে আছি জয় দেখব বলে। ওমা, কোথাকার কোন কানাডা এসে হারিয়ে দিয়ে গেল। সেবারের মতো ম্যাদামারা, পানসে ঈদ আজ অবধি কাটাইনি। পুরো ঈদটাই যেন মাটি হয়ে গিয়েছিল।

কান্না ? সেটাও দিয়েছে। এশিয়া কাপের সেই ফাইনালের কথা কি সারাজীবনেও ভোলা যাবে? মাঠে কাঁদছিল মুশফিক, সাকিবরা, আর তাদের সাথে কাঁদছিল পুরো দেশ। 

স্বপ্ন যেখানে দেখার সুযোগ, সেখানে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা থাকবেই। আনন্দের সাথে গলাগলি করে থাকবে বেদনারা। প্রাপ্তির সাথে থাকবে হতাশা, বঞ্চনা। ক্রিকেট ছাড়া এতসব অনুভূতির সাথে আমাদের আর একাত্ম করেছে কে?  ভাবতে অবাক লাগে, এক সময় একটা জয়ের অপেক্ষায় আমরা বসে থাকতাম দিনের পর দিন, এখন সেই জয় কতো অনাআয়সেই না আসে। ভাবা যায়, একসময় টানা পাঁচ বছর আমরা একটা ম্যাচও জিতিনি! একসময় একটা জয় পেলে টিএসসি ছুটে যেত সবাই, এখন সিরিজ জিতলেও তেমন কোনো উৎসব হয় না। কে জানে , পরেরবার হয়তো বিশ্বকাপ পেলেই...

আমাদের প্রজন্মটা অনেক কারণে ভাগ্যবান। আমরা টেন্ডুলকার লারাদের স্বর্ণযুগ দেখেছি, দেখেছি ম্যাকগ্রা, আকরাম, ওয়ার্ন, মুরালিদের। কিন্তু ব্যাঘ্রশাবকদের যে বেড়ে ওঠাটা চোখের সামনের দেখেছি, সেটাকেই আমি এই প্রজন্মের পরম পাওয়া বলে মেনে নেব।

দিনশেষে ক্রিকেটেই তো আমরা দুদন্ড শান্তি খুঁজি !

Saturday, August 31, 2013

হুদাই ১ (জীবনে ফেরা)

১।
দুপাশে সাঁই সাঁই করে গাছেরা সরে যাচ্ছে। মাতাল হাওয়ায় উড়ছে চুল, দুধারে নীল পাহাড়ের হাতছানি। একবার তাকালে আর চোখ সরানো যায় না। সামনেই বাঁক, জোরে হাঁক দিয়ে উঠলাম- মামা, আস্তে...
ড্রাইভার সে কথা শুনলে তো! দারুণ দক্ষতায় গতি খুব একটা না কমিয়েই বাঁক কাটিয়ে যায়। আমি কান গুজে দেই হেডফোনে। চারপাশে বন্ধুদের সোল্লাস চিৎঅকার, গাড়ির টায়ারের কর্কশ শব্দ, বাতাসের হিসহিস ধ্বনি... সবকিছু থেকে চট করে আলাদা হয়ে যাই। ডুব মারি অতল জলের স্পন্দনে।
হোয়ার ওয়ার ইউ, হোয়েন আই ওয়াজ বার্নড অ্যান্ড ব্রোকেন। হোয়াইল দ্য ডে সিজড বাই ফ্রম মাই উইনডো ওয়াচিং...
এটুকু শুনেই চোখ মুদে ফেলি। আহ! কী অসাধারণ একটা গান। স্বর্গে গেলে কী এমন গান শোনা যাবে? 

২
গান বস্তুটা যথেষ্ট গোলমেলে। কখন কোন গান আপনার ভাল লাগবে সেটা বলা ভারি মুশকিল। হঠাৎ করে রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, বহুদিন পরে পরিচিত একটা গানের কলি শুনে মন হয়ে উঠেছে স্মৃতিমেদুর- এমন অনুভূতি প্রায় সবার কখনো না কখনো হয়েছে সেটা হলফ করেই বলা যায়। সুর তো আমাদের সবার রক্তেই, কারো কারো সেটা বের হয় গলা দিয়ে, আর বাকিদের মনের স্বরতন্ত্রীতে সেটা গুঞ্জরিত হতে থাকে অহর্নিশ।
আমি দ্বিতীয় দলে পড়ি। গানের ব্যাপারে আমি সর্বভূক,কোনো ধরনের গানেই আমার অরুচি নেই। প্রিয় গানের নাম বলতে বললে আমি তাই চট করে কিছু বলতে পারব না। কারণ, একেকটা গান আমার কাছে স্মৃতির প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেওয়ার মতো, কোন গানের সাথে কোনটা জড়িয়ে আছে বলা কঠিন। আমি সময় মনে রাখি সুরকে দিয়ে, স্মৃতি হাতড়াই গানের বাণীতে। সেজন্য প্রিয় গান মানে আমার কাছে নিভৃত স্মৃতিচারণের অনুভূতি।

৩
বলছিলাম পিঙ্ক ফ্লয়েডের কথা। তখনো ক্লাসিক রকের সাথে ওভাবে সখ্য গড়ে ওঠেনি। ফিরিঙ্গি গান বলতে বেশির ভাগ শোনা হত ধাতবসংগীত। তাও বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে। আমার নিজের ধাত সবসময় ধীরলয়ের দিকে। সেটার দৌড় তখনো বাংলাতেই ছিল। ক্লাসিক রকের অসাধারণ জগতটা আমার কাছে থেকে গিয়েছিল অনালোকিত।
ঠিক সেসময় আমার জগতটাকে লন্ডভন্ড করে দিল পিঙ্ক ফ্লয়েড। এক বন্ধুর পরামর্শে শুনলাম কামিং ব্যাক টু লাইফ। প্রথম দেখাতেই প্রেমের অনুভূতি কী সেটা আমি জানি না, কিন্তু প্রথম শোনাতেই প্রেমের অনুভূতিটা আমি ভালোমতই জানি। এই গানটাই আমাকে শিখিয়েছিল সেটা ।

৪
কাকতালীয়ভাবে এই গানটা শোনার পরেরদিনই বেরিয়ে পড়েছিলাম বাক্সপ্যাটরা নিয়ে। গন্তব্য বান্দরবান। যাওয়ার সময় মোবাইলে ভরে নিলাম গানটা। কে জানত সামনের কয়দিন আমাকে বুঁদ হয়ে থাকবে গোলাপী জাদুকরদের মূর্ছনায় ?
সেটাই ছিল বান্দরবানের গহীনে আমার প্রথম সফর। প্রথমবারের মতো পাহাড়কে কাছ থেকে দেখা, তারিয়ে তারিয়ে তার সৌন্দর্য উপভোগ করা। মেঘ চিরে যখন আমাদের চাঁদের গাড়ি বেরিয়ে আসত রৌদ্রালোকিত রাস্তায়, এখনও  মনে আছে তখন “আই ওয়াজ স্টেয়ারিং স্ট্রেইট, ইন্টু দ্যা শাইনিং সান” লাইনটা যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল অন্য এক জগতে।
নাহ, উপমাটা ঠিক ভালো হলো না। আসলে যেভাবে গানটার সঙ্গে স্মৃতির অনুভূতিটা ঠিক লিখে বোঝানো যাবে না। এই গানটা শুনেই মনে হয়েছে, এমন কিছু সৃষ্টি করেই চিরতরের জন্য শান্তিতে চোখ মুদে ফেলা যায়। এমন একটা গানই গিলমোরকে দেবে অমরত্বের স্বাদ।


Wednesday, July 24, 2013

মাঝরাতের আগে...

Like sunlight, sunset, we appear, we disappear. We are so important to some, but we are just passing through

ইংরেজিতে বিফোর মিডনাইট, বাংলায় মাঝরাতের আগে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের পর এবার মাঝরাত। একটা জীবনকে যেন বেঁধে দেওয়া বন্ধনহীন গ্রন্থিতে। যেন পুরো জীবনটাকেই তুলে আনা সেলুলয়েডের আলাদা তিনটি ফ্রেমে। আর বিফোর মিডনাইট যেন আগের দুটোর চেয়েও অনেক পরিণত, অনেক বেশি জীবনঘনিষ্ঠ।


সেলিন (জুডি ডেলপি) আর জেসে (ইথান হক) এই সিনেমায় মধ্যবয়স্ক দুইজন মানুষ। সেই ফ্রান্সে যখন শেষ দেখা হয়েছিল, নয় বছর পর তাদের যুগলবন্দি আবার দেখলাম। এই কয় বছরে বদলে গেছে অনেককিছু, জেসে এখন ঔপন্যাসিক হিসবে বেশ নামডাক কামিয়েছে। আগের সম্পর্ক যুকিয়ে দিয়ে এখন ঘর বেঁধেছে সেলিনের সঙ্গে।  কাগজে কলমে বিয়ে হয়নি তাদের। একসাথে থাকছে বটে। ফুটফুটে দুটো জমজ মেয়ে আছে তাদের।


সিনেমার কাহিনি শুরু গ্রিসে ছুটি কাটানোর শেষ দিনটিতে। আগের স্ত্রীর সন্তান হাঙ্ককে বিমানে তুলে দেওয়ার দৃশ্যতেই চোখ আটকে যাবে আপনার। সেই থেকে শুরু, এরপরের এক ঘণ্টা ৪৮ মিনিট যেন আমাদের সবার জীবনের একটুকরো ছবি।
জীবনটা আসলে কী? এই এগিয়ে যাওয়া পৃথিবীতে আসলে কি খুঁজছে সবাই ? ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটিতে গিয়ে আসলে কি বিসর্জন দিতে হচ্ছে মানুষকে? প্রিয়জনকে বিদায় জানানোর বেদনা আসলে কতটুকু? এবং সবার ওপরে মানুষ শেষ পর্যন্ত কি একরকম আপোসেই মেনে নেয় সবকিছু? যে জীবনটা সে কাটাতে চায় সেটা আসলে কাটাতে পারে কয়জন?

আমাদের সবার মনেই কখনো না কখনো এই প্রশ্নগুলো এসেছে। জেসি আর সেলিনের কথোপকথনে চকিতে এগুলো হানা দিয়ে গেছে বেশ কয়েকবার। এবং অবশ্যই একেবারে আটপৌরে ভঙ্গিতে। আমরা যেমনটা বলি, কথার পিঠে কথার সাথে যেমন জড়িয়ে থাকে গভীর জীবনদর্শন, অনেকটা সেরকম। এবং মানুষ যে উত্তরগুলোর সুলুকসন্ধান করে ফিরবে আরও অনেকদিন বোঝা গেছে সেটাও।

শেষদিকে বেশ কয়েকবার জেসকে দাঁড়াতে হয়েছে সেলিনের কাঠগড়ায়? কি চায় জেস? সে কি ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজের কাটতি চায় , ছেলের সাথে থাকতে চায়? নাকি সেলিনের কথা মেনে নিয়ে সে ইউরোপেই থেকে যাবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে আপনাকে অবশ্য ছবিটা দেখতে হবে।

নিজের অনুভূতির কথা বলি। আমি ইথান হক আর জুডি ডেলপির ভক্ত। তাদের রসায়ন আমার কাছে খুবই সাবলীল লাগে। এমনিতেই অবশ্য ছবিটার চিত্রনাট্য লেখার সময় পরিচালক রিচার্ড লিঙ্কলেটারের সাথে এই দুজনও ছিলেন। সংলাপ যে ছবির আসল প্রাণ হতে পারে, এটা দেখার জন্য বিফোর ট্রিলজির চেয়ে ভালো উদাহরণ খুব কমই আছে। এই পড়তি বয়সে এসে দুইজনেই আগের চেয়েও যেন অনেক বেশি প্রাণবন্ত,অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। অনেকটা পুরনো মদের মতো।
 
তবে সংলাপনির্ভর ছবির একটা দুর্বল দিক আছে। একটু একঘেয়েমি পেয়ে বসতে পারে দর্শককে। তবে আগের দুই পর্ব যারা দেখেছেন, তারা নিশ্চয় জানেন এই ছবিতে অন্তত সেরকম কিছু থাকবে না।  তাদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই, এটা বলেই দেওয়া যায়!


সব মিলিয়ে বিফোর ট্রিলজি আমার কাছে একটা স্পেশাল জায়গা পেয়ে গেল। পরের পর্ব যখন হবে, তখন সেলিন-জেসে আরও বুড়িয়ে যাবে। বুড়িয়ে যাব আমিও। কিন্তু যদি আসে, সেটা মিস করব না এটা হলফ করে বলে দিতে পারি। 

Friday, May 31, 2013

একা এবং কয়েকজন

কলেবরে পৃথুল উপন্যাস পড়ার কিছু হ্যাপা আছে। সেরকম মন লাগিয়ে পড়তে আ পারলে আধাখেচড়া পড়ে থাকা বইয়ের সংখ্যা একেবারে কম না। আবার কিছু কিছু উপন্যাস আছে, যা নিজগুণেই টেনে ধরে রাখে চুম্বকের মতো। একবার শুরু করলে সেখান থেকে বেরুতে পারার সাধ্যি কয়জনের ?
আমরা নশ্বর মানব। এক জীবনে কটা বই-ই বা পড়া যায় ? শুধুই মনে হয় কতকিছু বাকি রয়ে গেল। তবে কিছু বই পড়ার পর মনে হয় এটা না পড়লে বড় একটা অতৃপ্তিই থেকে যেত। একা এবং কয়েকজন ঠিক সেরকম একটা উপন্যাস।
এমনিতেই সুনীলের কাছে আমার ঋণ অনেক। তাঁর বই পড়েই কাঁদতে শিখেছিলাম।  ছাপার কালো অক্ষরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কীভাবে বুঁদ হয়ে থাকা যায় সেটা তো সুনীলই শিখিয়েছিলেন। আমার কৈশোর তছনছ করে দেওয়া লোকটা তো আর কম লেখেননি জীবনে! কিন্তু একা এবং কয়েকজন পড়ার পর কেবলই মনে হচ্ছে এই ঋণের পাহাড়সম বোঝা বুঝি আমাকে সারাজীবনই বয়ে বেড়াতে হবে। শোধ করার উপায় খোঁজাও বুঝি নিরর্থক।
সুনীলের চরিত্রগুলোর ওপরও আমার বড্ড রাগ। এমন অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে যায় আমার সবটুকুর সঙ্গে চাইলেও তাদের এড়িয়ে চলা কঠিন। এখন যদি আমি বলি আমার শয়নে শপনে জাগরণে শুধুই সূর্য, বাদল, রেণু তাহলে সেটা বড্ড নাটুকে হয়ে যাবে। কিন্তু পড়ার ঘোরলাগা সময়টুকুতে যে তারা আমার আত্মার আত্নীয় হয়ে ওঠে সেই সত্য আমি অস্বীকার করি কি করে ?
কে বলেছিল সূর্যকে এমন হতে ? পুরো পৃথিবীর ওপর যেন তাঁর প্রচন্ড অভিমান। নিজেকে গুটিয়ে রাখবে খোলসে ঢাকা শামুকের মতো। যখনই কেউ সেটা খুলে দেখতে যাবে তখনই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেবে তাদের। কে বলেছিল সুনীলকে এমন উদ্ধত একটা চরিত্র জন্ম দিতে ? নিরবতা কেমন হিরন্ময় হতে পারে সেটা তো সূর্যের চেয়ে বেশি কেউ বোঝাতে পারেনি । নিজেকে শেষ করে দেওয়ার এমন দুর্মর ইচ্ছাটা কি আমাদের সবারই কখনো না কখনো হয় না ? কিন্তু আমরা তো একটা পুতুলনাচের কুশীলব মাত্র। নাটাইটা কার হাতে আমরা জানি না, কিন্তু অভিনয় করে যাচ্ছি দিনের পর দিন; কোন ক্লান্তি, শৈথিল্য ছাড়াই।
বাদল, রেণু এরা তো আমাদের চারপাশেরই সবাই। নিজেকে বোঝার নিরন্তর অভিপ্রায় আমাদের মজ্জার ভেতর আছে, আমি আসলে কী সেটা তো গোটা এক জনমেও বুঝতে পারি না অনেকে। কিন্তু বাদল যেন আমাদের পথটা দেখয়ে দেয়। আবার দেখিয়ে দিয়েও যেন নিজেই সরে যায় অভিমানীর মতো।
চিরঞ্জীব, বড়বাবু, দীপ্তিদেরই বা ভুলে থাকি কি করে? তারা কী চায়, কেন তারা বেঁচে থাকে নিজেরাই জানে না। তাদের সবার মধ্যে হয়তো রক্তের বন্ধন নেই, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বড় একটা বন্ধন তাদেরকে গেঁথে রাখে অদৃশ্য সুতোয়। এত কাছের , তাও যেন বহুদূরের এসব মানুষদের কে এমন মমতা দিয়ে গড়ে তুলতে পারবেন সুনীল ছাড়া ?

বইটা পড়ার পর এসব কথাই মাথার ভেতর  ঘুরপাক খাচ্ছে অবিরত। জানি, এসব নেহাতই ছেঁদো কথা, ভাবাবেগ দিয়ে তো আর জীবন চলে না! এখানেই সুনীলের ওপর আমার ভীষণ রাগ। চাইলেও কি এদের ভুলে থাকা যায় ? মলাট বন্ধ করলেই তো আর একটা জগৎকে অস্বীকার করা যায় না। কোথাও না কোথাও আমরা যেমন দূরের নক্ষত্রদের মতো একা, আবার কোথাও কোথাও সেই একাকীত্বই যেন আমাদের সঙ্গ দেয় পরম সুহৃদের মতো। সুনীল না থাকলে এই বোধটুকুও বুঝি কখনো হতো না ! 

Wednesday, October 10, 2012

আমি এবং বুড়ো লোকটা ...

 আমি এবং বুড়ো লোকটা ...

ক্লাস সিক্সের এক অলস দুপুর। কয়েকদিন আগেই বেরিয়েছে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফল, হাতে অফুরন্ত অবসর। দিনমান কেটে যেত চরকির মতো বনবন করে এদিক সেদিক ঘুরে বেরিয়ে। নাওয়া খাওয়া ছাড়া টো টো করে বেড়ালে যেটা হয়, বেরসিক জ্বর এসে কাবু করল হঠাৎ। প্রথম কয়েকদিন তো জ্বরের প্রকোপ কমেই না। একটু যখন কমল, তখন ডাক্তার আঙ্কেল সাফ সাফ বলে দিলেন সাতদিনের কমপ্লিট বেড রেস্ট। বন্ধুরা যখন সমানে ছক্কা পিটিয়ে যাচ্ছে তখন আমি কিনা শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছি। কেমনটা লাগে বলুন তো? এমনই একদিন আমার জেঠু (আমি ডাকতাম জেঠূমণি) নিয়ে আসলেন পেপারব্যাকের কয়েকটি বই। একটার ওপর নীল তিমির ছবি, বড় বড় হরফে লেখা-তিন গোয়েন্দা , ভলিউম তিন-এক। এর আগে গোয়েন্দার কিছু বই পড়েছিলাম , কিন্তু সেভাবে বুঁদ হইনি তখনো। বইটা যেন আমার জগৎটাকে হঠাৎই এলোমেলো করে দিল। নাওয়া খাওয়া ভুলে পড়ে ফেললাম সবকটি বই। কখনো কিশোর, মুসা, রবিনদের নিয়ে চলে যাচ্ছি শ্বাপদসংকুল ভীষণ অরণ্যে, কখনো এনথনি শোঁপাকে তাড়া করতে করতে খুলছে হয়েছে সাতটি কাকাতুয়ার দুর্বোধ্য সব রহস্যের গেরো। আবার কখনো খুলতে হয়েছে রাইমিং স্ল্যাঙের জট। কয়েকটি দিন যেন স্রেফ উড়ে গেল । কিশোর, মুসারা কখন আমার অতি কাছের বন্ধু হয়ে গেল টেরই পেলামনা।

ধান ভানতে শিবের গীত অনেকই গাওয়া হল। মোদ্দা কথা হলো জেঠামণিই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন মায়াবী এক রহস্যের চাবি, যে দরজা দিয়ে একবার ঢুকলে বের হয় কার সাধ্যি? এর পর থেকে বাসায় এলেই হাতে করে নিয়ে আসতেন নিত্যনতুন সব সেবার বই। ট্রেজার আইল্যান্ড, ক্লিপার অব দ্য ক্লাউডস, টোয়েনটি থাউজ্যান্ড লিগ আন্ডার দ্য সির মতো বইগুলো তাঁর হাত ধরেই পড়া। নিজে ছিলেন অতি নির্বিরোধী সাদাসিধে একজন মানুষ। সরকারি চাকরি করতেন, আটটা-পাঁচটা অফিসের পরের সময়টুকু ডুবে থাকতেন বইয়ে। ক্লাসিক সাহিত্য টাহিত্য পড়তে কখনো দেখিনি, তাঁর সবসময়ের সঙ্গী ছিল কাজীদার মাসুদ রানা। তখনো কাঁচা বয়স, বন্ধুরা বলত মাসুদ রানা নাকি "বড়দের বই।" বড়দের বই,সেটা আবার কী জিনিস? ভেতরে ভেতরে পড়ার জন্য দুর্মর আগ্রহ হত, কিন্তু জেঠামণি তখনো ভাইপোর পাতে বইগুলো তুলে দেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করেননি। তবে মওকা পেলে উনার বুক শেলফ থেকে চুরি করে পড়ে ফেলতাম বই। যদ্দুর মনে পড়ে, প্রথম পড়া রানা ছিল অপহরণ। সেই টিউলিপ কনওয়ে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মেয়ে অপহরণের সেই দুর্ধর্ষ কাহিনি। খুব একটা বড়দের কিছু মনে হয়নি অবশ্য। আরেকটু বড় হয়েই আস্তে আস্তে সাবড়ে দিতে লাগলাম রানার অন্য বইগুলো ও । তখন বোধহয় পড়ি নাইনে কি টেনে। অগ্নিপুরুষ পড়ার কথা তো এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। ঈদের সময় আমরা সবাই তখন গ্রামের বাড়িতে। এমন সময় হাতের কাছে পেলাম অগ্নিপুরুষ, একদম আক্ষরিক অর্থে এক বসাতেই পড়েছিলাম পুরোটা। শেষ করার পর চাপা কান্না -বেদনার এক অদ্ভুত অনুভূতি যেন দলা পাকিয়ে উঠতে থাকার আমার মধ্যে। স্রেফ একটা থ্রিলারই, কিন্তু এমন দুর্দান্ত বই তখনো খুব একটা পড়িনি। বারবার শুধু মনে হত, কি হতো লুবনা মেয়েটা বেঁচে থাকলে? 


আরেকটা জিনিসের হাতেখড়ি ও তাঁর কাছেই, দাবা খেলা। ঠিক হাতেখড়ি বললে ভুল হবে, একদম গোড়ার দীক্ষাটা পেয়েছিলাম মার কাছে। কিন্তু ভদ্রমহিলা সংসার সামলে ছেলেকে সবসময় সময় দিতে পারতেন না। তাই জেঠুমণি বাসায় এলেই আমি বসে যেতাম দাবার বোর্ডে। জেতার অদ্ভুত একটা জেদ তখন এই অপোগন্ড বালকের মাঝে ভীষণভাবে কাজ করত, যতক্ষণ না পারছি ততক্ষণ খেলেই যেতে চাইতাম। একবার কীভাবে যেন দুম করে উনাকে হারিয়ে দিলাম। তখন আমাকে আর পায় কে? জিতেছি জিতেছি বলে সারা বাড়ি মাথায় তোলাটুকুই বাকি ছিল কেবল। উনার ঠোঁটে কি একটা মুচকি হাসি খেলা করেছিল? হতে ও পারে, ভাইপোকে অনেক কিছুর বিনিময়ে কিনতে না পাওয়া আনন্দটুকু দেওয়ার জন্য উনি নিশ্চয়ই এতটুকু ছলনা করতে দুবার ভাবেননি! দাবা খেলায় খুব ভালো ছিলাম বলবনা, তবে ভিতটা মজবুত করে দিয়েছিলেন ঐ কাঁচাপাকা চুলের বুরুশ করা ভদ্রলোকই। 

বয়সে আমার বাবার চেয়েও ছিলেন বড়, কিন্তু আমার সাথে আচরণ করতেন সমবয়সীর মতো। খেলাপাগল ছিলেন ভীষণ, ক্রিকেট খেলার খুঁটিনাটি তাঁর কাছেই শেখা। আর একটা অদ্ভুত শখ ছিল তাঁর, রেডিও শোনা। প্রায়ই শুনতাম রেডিওটা কানের কাছে গুঁজে বসে আছেন। পুরনো দিনের মানুষ ছিলেন বলেই হয়তো সবার সাথে তাল মিলিয়ে পুরোপুরি আধুনিক হতে পারেননি। শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভীষণ ভুগতেন, বেশ কিছুদিন পর পর হাসপাতালে যেতে হতো। শেষ নয়সে তো হাসপাতালের বেডই হয়ে গিয়েছিল স্থায়ী ঠিকানার মতো। যৌবনে চেইন স্মোকার ছিলেন বলেই নাকি জীবন সায়াহ্নে এসে ফুসফুসটা একেবারেই অকেজো হয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে ছিলেন, সেটাকে অবশ্য বেঁচে থাকা বলে কিনা জানিনা। একসময় নিজেই হয়তো চেয়েছিলেন মুক্তি পেতে, শেষদিকে এসে কোন অব্যক্ত যন্ত্রণায় সেটার কি আভাস দিয়েছিলেন? অন্তত আমার সেরকমই মনে হয়েছিল।

সেবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সেই চুপচাপ মানুষটি কদিন আগেই বড় চুপিসারে চলে গেলেন। এক     অঝোর বর্ষণস্নাত দিনে চলে গেলেন নীরবে। আমি এই ইটকাঠের খাঁচায় পড়ে ছিলাম বড় অসহায় হয়ে, সামনে অগ্নিপুরুষের খোলা পাতা, তার মাঝে মুচকি হাসছেন বুড়ো লোকটা...







Wednesday, December 14, 2011

চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়-১ (র‍্যাগ কর্নার)

বুয়েট জীবনের শুরু থেকে তেরছাভাবে ওইদিকে তাকিয়ে থাকতাম, মেশানো ছিল খানিকটা সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধা। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোনায় ঐ সংকীর্ণ জায়গাটা আসলে কি, এমন সওয়ালও মনে হামেশা উদয় হত। একদিন জানলাম ওটার নাম র‍্যাগ কর্নার। ওখানে র‍্যাগ দেওয়া হয়না জানতাম, পরে জেনেছিলাম ওটা ছিল শেষ বর্ষের ছাত্রদের জন্যই এক্সক্লুসিভলি বরাদ্দকৃত। এরপর অনেকগুলো টার্ম পেরিয়ে গেল, ক্যাফেটেরিয়ার দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় আড়চোখে চেয়ে প্রায়ই ভাবতাম, আর বেশি দেরি নেই, এবার র‍্যাগ কর্নারে একটা আস্তানা গেঁড়ে ফেলবই।

দেখতে না দেখতেই(বলা ভাল কিছু বুঝে ওঠার আগে) ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র বনে গেলাম। এইবার আর আমাদের ঠেকায় কে? এতদিন সিনিয়রদের গানের তালে তালে হল্লামাস্তি করতে দেখেছি, এবার আমাদের মওকা। শুরুর দিন থেকেই মনে বেশ একটা উড়ো উড়ো ভাব, আমরা র‍্যাগ ব্যাচ, আমাদের জন্য র‍্যাগ কর্নার আদপেই ছিল একটা স্পেশাল প্রিভেলেজ। এবার শুরু হল র‍্যাগ কর্নারকে নিজেদের মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজানোর পালা। অনেক হ্যাপার পর, ক্যানভাসার রংমিস্ত্রিদের মুন্সীয়ানায় একসময় র‍্যাগ কর্নার বেশ একটা খোলতাই রূপ নিল। ক্যানভাস ০৬ এর বর্ণালীতে তখন সেটা উদ্ভাসিত। আমরাও কিঞ্চিত কালবিলম্ব না করে ঝটপট ছবি তুলে ফেলতে লাগলাম, বলা বাহুল্য অনেকটা আয়োজন করেই।

গোড়ার দিকে অবশ্য র‍্যাগ কর্নারে ছেলেপেলে খুব একটা ঢুঁ মারতনা, আমরা, ক্যাম্পাসের চেনা কিছু মুখগুলোই কুমীরের বাচ্চার মত করে নিজেদের হতশ্রী বদন নিয়ে বসে থাকতাম চাতক পাখির মত। কিন্তু ৪-১ এর বেশ কিছুদিন পরে যখন সাউন্ডবক্স চলে আসল তখন আমাদের যাকে বলে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত দশা। নিজেদের ইচ্ছেমত গান বাজিয়ে পুরো পলাশীস্থিত এলাকা মাত করে দিয়ে আমরা ক্ষরিক অর্থেই পৈশাচিক আনন্দ পেতাম। আমরা নাম্বার অফ দ্য বিস্টের সাথে সজোরে মাথা ঝাঁকাতাম, সুইট চাইল্ড ও মাইনের সাথে আনমনে গুনগুন করে উঠতাম, পাগলা হাওয়ার তোড়ে হেঁড়ে গলা ছেড়ে গান ধরতাম। এরপর র‍্যাগ কর্নার ধীরে ধীরে জমজমাট হওয়া শুরু করল। চায়ের কাপে, সিগ্রেটের ধোঁয়ার কুন্ডলীতে আমাদের দিনগুলো কেটে যেত বেশ। আগে ব্যস্ততা যাদের অবসর দিতনা তারাও এখন সুযোগ পেলেই একপলক দেখা করে যেতে ভুলতনা। ক্লাসের অবসরে আমরা দল বেঁধে জড়ো হতাম, ব্রেকের পরেও আড্ডার তোড়ে কখন আরেকটি ক্লাসের সময় এসে যেত টের পেতামনা। দেখা যেত, ম্যানইউ-আর্সেনালের তোপে, এল ক্লাসিকোর দাপটে, কখনোবা আশরাফুলের চোদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ক্লাসগুলোও ফাঁকি মেরে পালিয়ে যেত।

৪-২ থেকে অবশ্য র‍্যাগ কর্নারের আসল মহিমা আমরা মর্মে মর্মে টের পেতে শুরু করি। একদিন সাহস করে একটা দুষ্টু গানের সাথে উদ্দাম নৃত্যের পর একটু একটু করে আমাদের সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। এরপর আমরা যেমন রক অ্যান্ড রোলের তালে তালে গলা মেলাতাম, ঠিক তেমনি চটুল গানের সাথে রুপবানেরাও কোমর দুলিয়ে নাচতাম। র‍্যাগ কর্নার এবার আসলেই জমজমাট, যারা আগে কস্মিনকালেও ক্যাফের ছায়া মাড়ায়নি, তারাও একে একে আমাদের মত অপোগণ্ডদের দলে বিলকুল মিশে গেল। তড়িৎকৌশল, কম্পুকৌশলের দোস্তরাও এবার ফাঁক পেলেই সেই সাত সমউদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে পলাশীর প্রান্তর থেকে জড়ো হত এখানে। এমনিভাবে অনেক নতুন মুখের সাথে দেখা হল, অনেকের সাথে অন্তরঙ্গতাও হয়ে গেল ভীষণভাবে। সাথে সাথে সামনের একচিলতে খালি জায়গায় ব্যাট বল নিয়ে কসরত করা হত ফুরসত পেলেই। সাউন্ড সিস্টেমের প্রকম্পিত গানের সাথে খেলা, সাথে সাথে সব টিপ্পনী ফোঁড়ন কাটা তো চলতই।

র‍্যাগ কর্নারের পিক হাওয়ার যদি বলি, তাহলে সেটা বেলা একটাতেই। থিসিস, ক্লাসটেস্ট দিয়ে হেঁদিয়ে পড়া জনগণ তখন জুড়ে দিত নাচের মচ্ছব, আর কি বিচিত্র সেইসব নাচের মুদ্রা। শোভন-অশোভন সবরকম গানের সাথেই চলত সব নিত্য উদ্ভাবিত নাচের মুদ্রার জলসা।বেলা একটা দুইটা প[আর হয়ে যেত, কিন্তু নাচের আসর কমতনা। এমনকি ক্যাফের সামনেও নৃত্যপটিয়সী আমাদের প্রায়ই শরীর ঝাঁকাতে দেখা যেত। ওদিকে প্রতিদিনই চলত ফটোসেশন, একেকজনের ছবি তোলার আবদার মেটাতে মেটাতে ক্যামেরবাজরা প্রায়ই জেরবার হয়ে পড়ত। তবু যেন কারো আঁশ মেটেনা, ফেসবুক প্রোফাইলে দুদিন পর পর খোমা পরিবর্তনই এর উৎকৃষ্টতম সাক্ষী।

আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, এই কদিনে র‍্যাগ কর্নারে ফূর্তির বহর আসলেই ছিল লাগামছাড়া। মিউসিক্যাল চেয়ারে রোল নাম্বার পাওয়া নিয়ে সবার অত্যুৎসাহ সেই ফূর্তিতে যোগ করল নতুন মাত্রা। কারো কারো দৈনিক রুটিন এখন আদতেই র‍্যাগ কর্নার টু হল, হল টু র‍্যাগ কর্নার, ক্লাসের কোন ছায়া না মাড়িয়েই। এই সময়টাতে এসে মনে হচ্ছে, আর কিছুদিন পরেই আমরা এই নিজভূমে হয়ে পড়ব আগন্তুক, আপন জায়গাটা হয়ে পড়বে অচেনা। দুত্তোর, এইসব মন খারাপ করা ছেদো কথা আর না লিখি, আরও তো কটা দিন আছেই। দেখা হবে র‍্যাগ কর্নারে সপ্তা পেরিয়েই, আমি আসছি, আপনি আসছেন তো?

ঢাকার প্রেম

  ‘আমরা তিনজন একসঙ্গে তার প্রেমে পড়েছিলাম : আমি , অসিত আর হিতাংশু ; ঢাকায় পুরানা পল্টনে , উনিশ-শো সাতাশে। সেই ঢাকা , সেই পুরানা পল্টন , সেই ...